ডেস্ক রিপোর্ট:
দেশের বৃহত্তম সরকারি ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রথম পূর্ণ অর্থবছরেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। একই সময়ে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে এটিই একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে, বাকি চারটি কারখানা সম্মিলিতভাবে ৪১৪ কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনেছে।
দেশে কৃষিখাতে সার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নরসিংদীর পলাশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই মেগা সার কারখানা নির্মাণ করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৩ সালের নভেম্বরে কারখানাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে ইতিবাচক আর্থিক ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার কারখানা হিসেবে বিবেচিত ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সার সরবরাহ ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় দেশীয় কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ আরও স্থিতিশীল করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৯ জুন প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, উৎপাদন শুরুর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে কারখানাটি কোনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। তবে ব্যবস্থাপনা ব্যয়, ঋণের সুদ এবং অন্যান্য আর্থিক দায়ভার বহনের কারণে সে সময় প্রতিষ্ঠানটির ৩৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থানে পৌঁছেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার লাভ করলেও একই সময়ে অন্যান্য সরকারি ইউরিয়া কারখানাগুলো কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। মূল কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত চাপ ও পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চারটি কারখানাই বড় অঙ্কের লোকসানে পড়ে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী সার উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। ফলে উৎপাদনের প্রথম বছরেই প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা গেছে এবং সেটিই আর্থিক সাফল্যের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে ১১০ একর জমির ওপর এই আধুনিক সার কারখানাটি নির্মাণ করে। প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন এবং বছরে প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকায় এটি দেশের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে দেশীয় বাজারে ইউরিয়া সার বিক্রি থেকে এসেছে ১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি হিসেবে পাওয়া গেছে আরও ৮৯৯ কোটি টাকা।
একই সময়ে কোম্পানির মোট মুনাফা দাঁড়ায় ৯০১ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় হিসেবে ১৭০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বাদ দেওয়ার পর পরিচালন মুনাফা প্রায় ৭৩০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এছাড়া ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) ও অন্যান্য বিনিয়োগের সুদ থেকে প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় করেছে। অর্থবছর শেষে বিভিন্ন ব্যাংকে কোম্পানির ২৫১ কোটি টাকার এফডিআর জমা ছিল।
তবে লাভের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধে উল্লেখযোগ্য ব্যয়ও বহন করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। গত অর্থবছরে ঋণের সুদ ও আসলের কিস্তি পরিশোধে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি মোট দায় বর্তমানে ১২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা এবং সরকারের এডিপি ঋণ ১ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৭ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থা (এমআইজিএ)-সমর্থিত টার্ম লোনের অবশিষ্ট ছিল ৩ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এই দুই বিদেশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট প্রায় ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে কোম্পানিটি।
আগামী অর্থবছরের সম্ভাবনা সম্পর্কে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি লাভ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হওয়ায় এবার মুনাফার পরিমাণ কিছুটা কম হতে পারে।
তার ভাষ্য, গ্যাসের ঘাটতির কারণে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯০ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। অর্থবছর সদ্য শেষ হওয়ায় আয়-ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব এখনও সম্পন্ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ঋণের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও উৎপাদন শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আয় থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হচ্ছে। ১০ বছর মেয়াদি ঋণের ইতোমধ্যে ছয়টি কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে প্রতিষ্ঠানটি আরও বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চার সরকারি ইউরিয়া কারখানার সম্মিলিত লোকসান ৪১৪ কোটি টাকা
শিল্প মন্ত্রণালয়ের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিসিআইসির অধীনে বর্তমানে পাঁচটি ইউরিয়া এবং দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া সংস্থাটির নিজস্ব মোট ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে আরও ১০টি কারখানা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে কেবল ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজারই মুনাফা করেছে। অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪১৪ কোটি টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের। শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের লোকসান ১৩৪ কোটি টাকা, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের ৩৩ কোটি টাকা এবং যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের লোকসান প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
একই অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানাগুলো থেকে মোট ১১ লাখ ২৮ হাজার টন ইউরিয়া, ৭২ হাজার টন ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) এবং ৪৯ হাজার ৫৩২ টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) উৎপাদিত হয়েছে। তবে দেশের মোট চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট না হওয়ায় বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টন ইউরিয়া সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে।
মন্তব্য করুন