বিশেষ প্রতিনিধি : অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স ( জিসিডিজি) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র এবং তার সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতা, জাতিসংঘের প্রতিবেদন, ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ড, বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে গত দুই বছরে যা ঘটেছে, তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা নয়; বরং সংবিধান, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকেও এগিয়ে যেতে পারে।
‘আমি কোনো মন্ত্রী ছিলাম না, তবুও হত্যা ও গণহত্যার আসামি’
বক্তৃতার শুরুতেই সজীব ওয়াজেদ জয় নিজের বিরুদ্ধে আনা মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তিনি আওয়ামী লীগের কোনো পদধারী নেতা নন; কেবল দলের একজন সদস্য। সরকারের কোনো সাংবিধানিক পদেও তিনি ছিলেন না। শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সম্মানসূচক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণার মিডিয়া বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছেন।
তিনি বলেন, জীবনের প্রায় পুরো সময়ই তিনি বিদেশে কাটিয়েছেন এবং প্রায় ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ২০২৪ সালে তিনি মাত্র একবার, এপ্রিল মাসে, এক সপ্তাহ থেকে দশ দিনের জন্য বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। এরপরও জুলাইয়ের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তার দাবি, এসব মামলার বিষয়ে তিনি কোনো আদালত বা সরকারি সংস্থার কাছ থেকে কোনো নোটিশ পাননি; গণমাধ্যম থেকেই বিষয়টি জানতে পেরেছেন।
‘শুধু রাজনীতিবিদ নয়, সাংবাদিকরাও দুই বছর ধরে কারাগারে’
জয় দাবি করেন, শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নয়, সাবেক প্রধান বিচারপতি, শত শত সাংবাদিক, সম্পাদক এবং গণমাধ্যমের মালিকও দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। তাদের অনেকেই রাজনীতি বা সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সমালোচনা করে সজীব ওয়াজেদ বলেন, প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারকে ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের (UNSRE) নিজস্ব হিসাবেই নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ বা ৮৩৬।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা বহুবার জাতিসংঘের কাছে ওই ১ হাজার ৪০০ জনের নামের তালিকা চেয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তার ভাষায়, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে মাত্র ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে, অথচ প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ অনেক পুলিশ সদস্য এখনো নিখোঁজ।
‘শত শত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী নিহত হলেও তার হিসাব নেই’
সজীব ওয়াজেদের দাবি, ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে শত শত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। কিন্তু জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এসব ঘটনার যথাযথ প্রতিফলন নেই। এমনকি ওই সময়ের পর বিচারিক হেফাজতে মৃত্যুসহ আরও বহু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যেগুলোও আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে।
‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশই হত্যার স্বীকারোক্তি’
তার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইউনূস সরকারের জারি করা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ (Indemnity Ordinance) নিয়ে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি আন্দোলনকারীরা কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত না থাকেন, তাহলে তাদের সব ধরনের হত্যার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আলাদা আইন করার প্রয়োজন হলো কেন?
তার মতে, এই অধ্যাদেশই পরোক্ষভাবে স্বীকার করে যে আন্দোলনের সময় পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন এবং আন্দোলনকারীদের সেই দায় থেকে রক্ষা করতেই আইনটি করা হয়েছে।
‘শুধু আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করা হচ্ছে’
জয় বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মানবাধিকার পরিস্থিতি নিখুঁত ছিল না—এ কথা তিনি অস্বীকার করছেন না। কিন্তু যদি রাজনৈতিক কর্মী, পুলিশ সদস্য এবং অন্যান্য মানুষের হত্যাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উপেক্ষা করা হয় এবং শুধু আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করা হয়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার হতে পারে না।
তার ভাষায়, “একমুখী বিচার কখনোই প্রকৃত বিচার নয়।”
‘আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে’
সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রসঙ্গে সজীব ওয়াজেদ বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী কারচুপি, গভীর রাতে ব্যালট বাক্স ভরার অসংখ্য ভিডিও থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচনকে গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে কেবল একটি ছোট্ট মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে তারা নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে।
‘ইউনূস সরকারের দুই বছর ছিল অসাংবিধানিক’
তার অভিযোগ, ইউনূস সরকারের পুরো সময়টাই ছিল অসাংবিধানিক। এটি ছিল একটি অনির্বাচিত সরকার, যারা ক্ষমতা দখল করে নিজেদের মতো করে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য জামিন ছাড়া আটক রাখার সুযোগ তৈরি করা—এসবের কোনো সাংবিধানিক বৈধতা ছিল না।
‘বিএনপি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রাখেনি’
বিএনপির সমালোচনা করে সজীব ওয়াজেদ বলেন, তারা পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে আগের সব সংশোধনী বহাল রেখেছে।
তার দাবি, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার রাজনৈতিক দায় ইউনূস সরকারের ওপর পড়ায় বিএনপির জন্য সেই নীতি অব্যাহত রাখা সহজ হয়ে গেছে।
তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপি ওয়াশিংটনে প্রতিনিধি পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, যাতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রেখেই বাংলাদেশে নির্বাচন সমর্থন করা হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নিজেদের ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা।
‘দেশের ৪০ শতাংশ মানুষকে উপেক্ষা করা যাবে না’
সজীব ওয়াজেদের মতে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলেও দলটির প্রতি এখনো দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার যতই দমন-পীড়ন বাড়াক, আইনশৃঙ্খলার অবনতি যতই ঘটুক এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিপীড়ন যতই চলুক, এই বিপুল জনগোষ্ঠী একসময় প্রতিক্রিয়া দেখাবেই। তাদের চিরদিন কোণঠাসা করে রাখা সম্ভব নয়।
‘বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে’
সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তায় তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
তার মতে, সংবিধানকে উপেক্ষা করা, রাজনৈতিক প্রতিশোধকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করা এবং আইনের শাসন দুর্বল করে দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতের কোনো এক সময়—পাঁচ, দশ বা পনেরো বছর পর—বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
সজীব ওয়াজেদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গত দুই বছরের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দায়মুক্তি এবং অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এখনই অবস্থান নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, যদি বিচার চাইতেই হয়, তবে তা সবার জন্য সমানভাবে হতে হবে। একতরফা বিচার কোনো ন্যায়বিচার নয়।
‘সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া যায় না’
তিনি বলেন, কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন জনগণের সম্মতি ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া যায় না। তা দীর্ঘস্থায়ীও হয় না। সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র সংস্কার করতে হবে।
জামায়াত প্রসঙ্গে মন্তব্য
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে সজীব ওয়াজেদ বলেন, দলটি কখনোই বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের গ্রহণ করে না। এমনকি বিএনপির অনেক সমর্থকও জামায়াতকে অপছন্দ করেন বলে তিনি দাবি করেন।
বক্তৃতার শেষে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, সমান বিচার এবং সংবিধানের শাসনে ফিরে যাওয়া জরুরি। অন্যথায় বর্তমান সংকট আরও গভীর হবে।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য প্রদান করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য (MEP ) এবং সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস এর পাবলিক ল-এর অধ্যাপক ও গবেষণা পরিচালক তারুণ কাইতান
ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন (IHRC) উপ-রাষ্ট্রদূত স্যার ভিনসেন্ট লিন
সরাসরি উপস্থিত প্যানেল বক্তারা হলেন –
সৈয়দ বদরুল আহসান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক
অধ্যাপক ড. রায়হান রশিদ, আইন অনুষদ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
সুইডেনের ল এটর্নি মোনা হাঘগু স্ট্রিন্ডবার্গ
ড. আশফাক আলম, অ্যাফিলিয়েট একাডেমিক, কিংস কলেজ লন্ডন
বিশেষ অংশগ্রহণকারী
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন যুক্তরাজ্য ভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন
সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাত, সভাপতি, গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স, কানাডা
মন্তব্য করুন