HMI
১৭ জুলাই ২০২৬, ৪:৩৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় উত্থান: দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে ফিদেল কাস্ত্রোর পুরোনো সতর্কবার্তা

ডেস্ক রিপোর্ট:

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একসময় নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত করা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এখন দৃশ্যমানভাবে ধর্মীয় প্রতীক ও ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, সেটিও নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি লিখেছেন দ্য প্রিন্টের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর দীপ হালদার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনীতি, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে ইসলামপন্থী প্রভাবের যে বিস্তার গত কয়েক বছরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, তার প্রভাব এখন সেনাবাহিনীতেও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ জুন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ভাটিয়ারীতে নতুন একটি ইউনিট গঠন করা হয়, যার চারটি কোম্পানির নাম রাখা হয়েছে ইসলামের প্রথম চার খলিফা—উমর, আবু বকর, আলী ও উসমানের নামে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এই ধরনের ধর্মীয় নামকরণ এই প্রথম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, এর আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোর নাম সাধারণত ভৌগোলিক এলাকা, সংখ্যা কিংবা প্রশাসনিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হতো। সেই দীর্ঘদিনের রীতি থেকে সরে এসে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামে ইউনিটের নামকরণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ইউনিটের নামই নয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।

গত বছরের ১৬ আগস্ট জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ সবার দেশ এবং ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন হবে না। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি ও বাঙালি—সবাই যুগের পর যুগ শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও সেনাবাহিনী সবার পাশে থাকবে।

কিন্তু চলতি বছরের ১৮ জুন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশনিং প্যারেডে দেওয়া ভাষণে তিনি সামরিক জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক আদর্শ অনুসরণের গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেন।

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজর কেড়েছে।

পাকিস্তানের সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলী কে চিশতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের এই পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। আগে তিনি ক্লিন-শেভ ছিলেন, এখন পূর্ণ দাড়ি রেখেছেন এবং সাম্প্রতিক দুটি বক্তৃতায় সেনাবাহিনীকে ইসলামী মূল্যবোধ ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেনাপ্রধানের এই অবস্থান পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন চারটি পদাতিক কোম্পানির নাম ইসলামের প্রথম চার খলিফার নামে রাখার ঘটনাও একই ধারার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম কে দাসের একটি নিবন্ধেরও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সেনাবাহিনীতে উগ্রপন্থী বা ইসলামপন্থী প্রভাব বিস্তারের কিছু চেষ্টা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর একটি অংশ ইসলামী ঐতিহ্য ও বর্ণনার প্রতি আরও বেশি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এম কে দাস আরও দাবি করেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে।

দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ঐতিহাসিক সাক্ষাতের প্রসঙ্গ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকে কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে বলেছিলেন, তিনি হিমালয় দেখেননি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক মানস ঘোষ তাঁর Mujib’s Blunders: The Power and the Plot Behind His Killing গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অতিরিক্ত উদারতা অনেক সময় নৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বইটির উদ্ধৃতি অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও কাস্ত্রো উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার মতে, এতে ভবিষ্যতে পাল্টা বিপ্লবের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মানস ঘোষের বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, কিউবায় বাতিস্তা সরকারের পতনের পর তিনি পুরোনো শাসকদের ঘনিষ্ঠ কাউকে রাষ্ট্রযন্ত্রে রাখেননি; বরং নিজের বিশ্বস্ত লোকদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বিপরীতে বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছিলেন।

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পরবর্তীতে পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থী উপাদান প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পথ তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার ঘটনাও স্মরণ করা হয়েছে। সে সময় বিবিসির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, একদল উগ্রপন্থী সামরিক কর্মকর্তা শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছিল, যা সেনাবাহিনী ব্যর্থ করে দেয়।

তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ রাজ্জাক জানিয়েছিলেন, ওই ষড়যন্ত্রে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন এবং তদন্তে ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গিয়েছিল।

দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণের উপসংহারে বলা হয়েছে, প্রায় দেড় দশক আগে ব্যর্থ হওয়া সেই অভ্যুত্থানচেষ্টার পর এখন আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনূসের স্বেচ্ছাচারিতা ও তারেকের অবহেলায় হামে এ পর্যন্ত ৮০৩ শিশুর মৃত্যু 

দেশে ফেরার ঝুঁকি আমি জানি: জাপানের কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা

দিল্লিতে মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, রাহুল-প্রিয়াঙ্কাসহ বিরোধী নেতারা আটক

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুম: মংলায় যুবক নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত দাবি এইচআরডাব্লিউ-এর

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই ফিরবে, ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়: জাফর ইকবাল

নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতির গলাকাটা লাশ উদ্ধার

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় উত্থান: দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে ফিদেল কাস্ত্রোর পুরোনো সতর্কবার্তা

পাকিস্তানের জুলুম থেকে বাঁচতে বেলুচিস্তান অবশেষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে?

৬ মাসে ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার, আহত ২৩৪: এইচআরএসএস

দেশে-বিদেশে আস্থা হারাচ্ছে সরকার, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত: জি এম কাদের

১০

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ ঘণ্টার আন্দোলনে ঢাবিতে বিজিবি: সরকারের পদক্ষেপে বিতর্ক

১১

এএফপির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ছয় মাসেও থামেনি হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাড়ছে উদ্বেগ

১২

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় এর হুঁশিয়ারি: বাংলাদেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে

১৩

নাম বদল: ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান কি নতুন মোড় নিচ্ছে?

১৪

ভয়াবহ বন্যা: তারেক রহমান কি ফ্যামিলি নিয়ে মজা করতেই থাকবেন?

১৫

চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ৪৩ জনের মৃত্যু, ৯ লাখ মানুষ দিশেহারা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা

১৬

মনজুরুল হক-এর কলাম: রুচিহীনতা দেখিয়েছে ‘ডেইলিস্টার’, ‘প্রথমআলো’, ‘মানবজমিন’

১৭

হামে শিশু মৃত্যু ৭৫০ ছাড়িয়ে গেছে, নির্বিকার সরকার, টিকায় ভেজাল

১৮

বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে শেখ হাসিনার পরিকল্পনা: দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে ডিসেম্বরে ফিরে আত্মসমর্পণ

১৯

পাকিস্তানের ব্যর্থ ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থ লুটের প্রকল্প

২০