ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ (Safe City) প্রকল্প অনুসরণের সরকারি আগ্রহকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানে বহুল আলোচিত এই প্রকল্পটি প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটির গণমাধ্যম ও সরকারি অডিট প্রতিবেদনে এটিকে একটি ব্যয়বহুল ও অকার্যকর প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পকে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাব্য মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যে প্রকল্প নিজ দেশেই কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, সেটি বাংলাদেশে অনুসরণ কতটুকু যৌক্তিক।
লাহোরের বোমা হামলায় ঘটনা তদন্তে ব্যর্থতা
২০২২ সালে পাকিস্তানের লাহোরের ঐতিহাসিক আনারকলি বাজারে ভয়াবহ বোমা হামলার পর তদন্তে সেফ সিটি প্রকল্পের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। হামলার সময় সরকারি সেফ সিটি নেটওয়ার্কের ক্যামেরাগুলো থেকে কার্যকর ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারীদের অপরাধীদের শনাক্ত করতে আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।
বিশ্লেষণে বলা হয়, এ ঘটনা প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
৯০০ কোটি টাকার নজরদারি ব্যবস্থা, অচল ছিল ৬০০০ ক্যামেরা
পাকিস্তানের গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, প্রায় ৯০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি ব্যয়ে নির্মিত লাহোরের সেফ সিটি প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও, সরকারি অডিটে দেখা যায় এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ক্যামেরা কার্যকর অবস্থায় ছিল।
বিশ্লেষণে বলা হয়, শুধু ক্যামেরাই নয়, প্রকল্পের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। বৃষ্টির সময় পর্যাপ্ত ব্যাকআপ বিদ্যুৎ না থাকায় ৯২টি ফোরজি (4G) যোগাযোগ টাওয়ার বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এছাড়া পুলিশের কল সেন্টারের ৩৩টি অপারেটর হেডসেট ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায় বলেও গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা প্রকল্পটির রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি এবং পরিচালন ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান কারিগরি সহযোগিতার আলোচনা
ভিডিওতে বলা হয়, চলতি জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ সাথে পাকিস্তানের ইন্টেরিয়র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভীর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা প্রযুক্তি ও সেফ সিটি মডেল নিয়ে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা অনুসরণের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
এরও আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব—বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব—পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, লাহোর, মুলতান ও করাচি শহরের সেফ সিটি প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নিরাপত্তা বিশ্লেষণকরা প্রশ্ন তুলছেন, পূর্ববর্তী অনির্বাচিত সরকারের সময় আলোচনায় আসা এ ধরনের বিতর্কিত প্রকল্প বর্তমান নির্বাচিত সরকার কেন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় সহজেই অচল হয়ে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ তদন্তেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেই মডেল বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ দেশে প্রয়োগ করা হলে তা জননিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।
তাদের ভাষ্য, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা শুধু বিপুলসংখ্যক ক্যামেরা স্থাপনের বিষয় নয়; বরং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, শক্তিশালী ডেটা সেন্টার, সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, জননিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে প্রকল্প নির্বাচন রাজনৈতিক সম্পর্ক বা কূটনৈতিক সৌজন্যের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক মান, ব্যয়-সাশ্রয় এবং বাস্তব কার্যকারিতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন