ডেস্ক রিপোর্ট:
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ (পেন্টাগন) থেকে আসা দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম যৌথ কমব্যাটেন্ট কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে আবারও “ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড” (USPACOM) করা হয়েছে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের শাংগ্রি-লা সংলাপে যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ এমন এক ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা ও নিরাপত্তা নীতির কথা বলেছেন, যা অনেকের কাছে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধুই একটি ঐতিহাসিক নাম পুনরুদ্ধার, নাকি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কৌশলে আরও গভীর পরিবর্তনের সূচনা?
সাত দশকের ইতিহাসে ফিরে যাওয়া
১৬ জুন ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ঘোষণা দেয়, “ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড” (USINDOPACOM)-এর নাম পরিবর্তন করে পুনরায় “ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড” (USPACOM) রাখা হচ্ছে।
পেন্টাগনের প্রকাশিত ব্যাখ্যায় বলা হয়, ১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের সময় প্রতিষ্ঠিত এই কমান্ড দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় “ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড” নামেই পরিচিত ছিল। কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো গঠন এবং সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সুসংহত করার ক্ষেত্রে এই কমান্ডের ঐতিহাসিক অবদানকে সম্মান জানাতেই পুরোনো নাম ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি মূলত ঐতিহাসিক পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সিদ্ধান্ত; এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল বা দায়িত্বের ক্ষেত্র পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে না।
এলাকা ও মিশন অপরিবর্তিত
পেন্টাগন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নাম পরিবর্তন হলেও কমান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা অপরিবর্তিত থাকবে।
এই কমান্ডের আওতা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এর অধীনেই রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগর, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ।
একই সঙ্গে “মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক” (Free and Open Indo-Pacific) নিশ্চিত করার যে নীতি গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করে আসছে, সেটিও বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো—এটি কৌশলগত পুনর্গঠন নয়; বরং ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
শাংগ্রি-লা সংলাপে হেগসেথের বার্তা
তবে এই ঘোষণার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ২৯ মে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলন শাংগ্রি-লা ডায়ালগে যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথের বক্তব্যে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা উঠে আসে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্নির্ধারণ করতে চায়। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় “ক্ষমতা ও স্বার্থের বাস্তবতা”কে সামনে রেখেই ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে।
বিশেষভাবে তিনি উল্লেখ করেন, ধনী মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার পুরো ব্যয় যুক্তরাষ্ট্র বহন করবে—এমন যুগ শেষ হয়ে এসেছে। হেগসেথ বলেন, “আমাদের দরকার অংশীদার, রক্ষিত রাষ্ট্র নয়।” এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ এখন মিত্রদের ওপর
হেগসেথের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের অধীনে মিত্রদের আরও বেশি আত্মনির্ভর হতে উৎসাহিত করবে। অর্থাৎ, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি দেশকেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমবে না; বরং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যেসব মিত্র নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়, তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরনও ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে।
চীনকে ঘিরে অবস্থান অপরিবর্তিত
যদিও মিত্রদের প্রতি বার্তা কিছুটা কঠোর ছিল, চীনের প্রশ্নে হেগসেথের বক্তব্যে কোনো নরম সুর দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কোনো একক শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না।
চীনের দ্রুত সামরিক সম্প্রসারণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চায় না; বরং “শক্তির মাধ্যমে শান্তি” (Peace Through Strength) প্রতিষ্ঠার নীতিতেই অটল থাকবে। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তি এবং এই অঞ্চলে তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বদলাচ্ছে?
দুটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে একটি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে।
একদিকে, পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে—নাম পরিবর্তন শুধুই ঐতিহাসিক পরিচয় পুনরুদ্ধার। কমান্ডের এলাকা, দায়িত্ব কিংবা সামরিক মিশনে কোনো পরিবর্তন নেই।
অন্যদিকে, যুদ্ধ সচিবের বক্তব্য স্পষ্টভাবে দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করছে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন অঞ্চল ছেড়ে যাচ্ছে না; কিন্তু নিরাপত্তার বোঝা একাই বহন করতেও আর আগ্রহী নয়।
বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে সীমিত করার একটি কৌশলী প্রক্রিয়া। তাদের যুক্তি, যখন মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক ভূমিকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বিশেষ করে যেসব দেশ দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে সক্ষম নয়, তারা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সহযোগিতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। তবে আরেকটি শক্তিশালী মত হলো—এটি কৌশলগত প্রত্যাহার নয়, বরং দায়িত্বের পুনর্বণ্টন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় একই কৌশল বজায় রাখছে; তবে এখন মিত্রদের আরও সক্ষম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে।
বাংলাদেশের জন্যও রয়েছে তাৎপর্য
এই নতুন অংশীদারিত্বভিত্তিক নিরাপত্তা নীতির প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, যৌথ মহড়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগেও ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও আগের তুলনায় বেড়েছে।
মূল পরিবর্তন কি নামে, নাকি সম্পর্কের ধরনে?
সবকিছু মিলিয়ে পেন্টাগনের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক কৌশলগত লক্ষ্য পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ মেলে না।
চীনের প্রভাব মোকাবিলা, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং একটি “মুক্ত ও উন্মুক্ত” ইন্দো-প্যাসিফিক নিশ্চিত করার লক্ষ্য এখনও ওয়াশিংটনের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবেই রয়ে গেছে। তবে পরিবর্তনটি ঘটছে কৌশল বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে।
অতীতের তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সহযোগিতাকে ক্রমশ “নির্ভরতাভিত্তিক সুরক্ষা” থেকে “দায়িত্ব ভাগাভাগিভিত্তিক অংশীদারিত্ব”-এ রূপান্তর করতে চাইছে।
ফলে কমান্ডের নাম পরিবর্তনের প্রতীকী গুরুত্ব যতটা, তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথের ঘোষিত নতুন অংশীদারিত্বের দর্শন।
ভবিষ্যতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সামরিক সম্পৃক্ততা, মিত্রদের ভূমিকা এবং চীনকে ঘিরে শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুই অনেকাংশে নির্ধারিত হবে এই নতুন মডেল কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর।
মন্তব্য করুন