কৃষ্ণ এন. দাস
নয়াদিল্লি, ১০ জুলাই (রয়টার্স):
ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি নিজ দেশে তাঁর দল নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি, রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশের সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা নেতা বলেছেন, তিনি এবং তাঁর আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় দুই বছর আগে যে দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে ফিরে যেতে চান এবং আদালতে নিজেদের হাজির করবেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেশটি কীভাবে মোকাবিলা করে তার পরীক্ষা হবে।
“আমার ফিরে যাওয়ার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি তারা আমাকে হত্যাও করতে পারে,” ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এবং শুক্রবার পর্যন্ত চলা প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন।
তিনি বলেন, “তারপরও আমাকে যেতে হবে। আমার দলের নেতাকর্মীরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যু আসে, আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছে।”
নির্বাসনের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন:
২০২৪ সালে বিক্ষোভের পর হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে নির্বাসনে যান। এর মাধ্যমে একাধিক মেয়াদে তাঁর ২০ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।
দেশটির যুদ্ধাপরাধ আদালত নভেম্বরে তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। অভিযোগ করা হয় যে, তিনি ছাত্র নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্বাসনে থেকে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
একটি পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে। কারণ ঢাকার সরকার দুই বছরের অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, এটি ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক উন্নত করতে পারে। কারণ নয়াদিল্লি তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে।
বাংলাদেশ বারবার ভারতকে তাঁকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে।
শেখ হাসিনা, যিনি সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের লিখিত উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু নির্বাসনের সময় এর আগে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি, বলেছেন—তিনি কখন বা আদৌ দেশে ফিরবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি।
তিনি বলেন, “এটাই প্রথমবার, যখন আমি আমার ফিরে আসার সময়সূচি নির্ধারণ করেছি, আত্মসমর্পণের কথা বলেছি অথবা আওয়ামী লীগের নির্বাসিত অন্য নেতারা আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছি।”
তাঁদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যিনি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। রয়টার্স অন্য দলীয় সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বা তাঁরা কোথায় আছেন তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকার কর্তৃপক্ষ “আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা বারবার ভারতকে চিঠি পাঠাচ্ছে যেন আমাকে ফেরত পাঠানো হয়। আমি নিজেই যাব।”
বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। এপ্রিল মাসে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তারা বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনা করছে এবং তারা “নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত হতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায়।”
একসময় গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন, এখন ভিন্নমত দমনের অভিযোগে অভিযুক্ত:
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্ধশতাব্দী ধরে একটি প্রভাবশালী চরিত্র। তাঁর পিতা, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যার পর তিনি রাজনৈতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন।
তিনি প্রথম দিকে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেন এবং ১৭ কোটি মানুষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর কৃতিত্ব পান।
কিন্তু তাঁর দীর্ঘ শাসনকাল নিয়ে অভিযোগ ওঠে যে তাঁর সরকার ভিন্নমত দমন করেছে এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে—যেসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের মতে, যে দমন-পীড়নের কারণে তাঁর পতন ঘটে, তাতে সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন।
দিল্লিতে তাঁর নির্বাসিত বাসা থেকে হাসিনা রয়টার্সকে বলেন:
“আমাদের প্রায় সব নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি এবং তোমাদের সবাইকেও আসতে হবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
তিনি তাঁর ফিরে আসার নির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানান এবং ঠিক কখন বা কোন আদালতে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন তাও বলেননি।
তিনি বলেন:
“আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি এবং আমি মনে করি, একবার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে আদালত কতটা প্রহসনমূলক এবং আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
“জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন”, বললেন শেখ হাসিনা:
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, তাঁর সরকার পতনের পর থেকে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী গ্রেপ্তার, মামলা এবং শারীরিক হামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।
তিনি বলেন:
“গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়।”
তিনি বলেন, কারাবাস নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ অতীতেও তিনি কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।
১৯৮১ সালে পিতার হত্যার পর নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসার পর তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বারবার আটক হন।
২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে আবার কারাগারে পাঠায়। পরে তিনি মুক্তি পান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করেন।
এবার তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে তাঁর জীবনের ওপর হুমকি, যখন উশৃঙ্খল আন্দোলনকারীরা তাঁর বাসভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
তিনি বলেন:
“যখন কোনো সরকার দীর্ঘদিন কাজ করে, তখন ভুল হতে পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু কোনো সরকারের ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।”
হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠক করেছেন।
তিনি বলেন:
“ক্ষমতাসীনরা হয়তো আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন।”
মন্তব্য করুন