ডেস্ক রিপোর্ট:
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রা, দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী জোটের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
মঙ্গলবার বিকেলে লোক কল্যাণ মার্গে (প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে) আয়োজিত এই কর্মসূচিতে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর অসংখ্য নেতাকর্মী অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, সর্বভারতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সিজেপি (CJP)-এর একটি সমাবেশে পুলিশের লাঠিচার্জ ও হামলারও প্রতিবাদ জানান তারা।
দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই অবস্থান কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, অখিলেশ যাদব ছাড়াও কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে.সি. বেনুগোপাল, কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি.কে. শিবকুমার, কেরালার বিরোধীদলীয় নেতা ভি.ডি. সতীশনসহ বিভিন্ন রাজ্যের নেতারা যোগ দেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে মোতায়েন পুলিশ তাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তবে কংগ্রেস নেতারা অবস্থান থেকে সরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিতে অভিযান শুরু করে। এ সময় রাহুল গান্ধী রাস্তায় বসে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যান। একইভাবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকেও জোর করে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়।
ঘটনার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির মধ্যে রাহুল গান্ধীর নাক থেকে রক্ত ঝরছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও রাহুলের রক্তাক্ত অবস্থার ছবি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ প্রকাশ করা হয়েছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি রাস্তায় শুয়ে পড়েন এবং চিৎকার করে বলেন, “ভারতে এখন এভাবেই গণতন্ত্র চলছে।”
অন্যদিকে একটি ভিডিওতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নারী পুলিশ সদস্যরা জোর করে প্রিজন ভ্যানে তুলছেন বলেও দেখা যায়। তিনি প্রথমে ভ্যানে উঠতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে পুলিশ তাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার আগে রাহুল গান্ধী ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি সারারাত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন। তিনি দেশের সাধারণ মানুষকেও সেখানে এসে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিক্ষোভের আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী লিখেছিলেন, “ছাত্রছাত্রীদের ওপর আক্রমণ মানে প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর আক্রমণ। প্রধানমন্ত্রী মোদী হয়তো মনে করেন, তিনি কোনো জবাবদিহি ছাড়াই পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু এবার আর তা হবে না। আমি প্রত্যেক দেশপ্রেমিক ভারতীয়কে আহ্বান জানাই, যারা মনে করেন শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে, তারা যেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে আমাদের এই আন্দোলনে যোগ দেন।”
এদিকে আটক নেতাদের মধ্যে কংগ্রেসের এমপি রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা ও সুখজিন্দর সিং রন্ধাওয়াও ছিলেন। পুলিশ ভ্যানের ভেতর থেকেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে রণদীপ সিং বলেন, “এটাই শেষ নয়, বরং রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এটি একটি নতুন আন্দোলনের সূচনা। সরকার আমাদের আটক করতে পারে, লাঠিচার্জ করতে পারে, কিন্তু যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে ভবিষ্যৎ হারিয়েছে, সেই লাখো শিক্ষার্থীর কাছে একদিন না একদিন জবাব দিতেই হবে।”
কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি.কে. শিবকুমারও এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটক করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছি। আমরা চাই সংসদে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হোক। শতাধিক সাংসদ এখানে উপস্থিত আছেন। গ্রেপ্তারের ভয় আমাদের নেই। ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”
টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে সিজেপির পদযাত্রা এবং সেখানে পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনার পর কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতেই কংগ্রেস মঙ্গলবারের এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে রাহুল গান্ধী ও অন্যান্য বিরোধী নেতাদের আটকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
মন্তব্য করুন