ডেস্ক রিপোর্ট:
জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নতুন করে গুমের অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, খুলনার মংলায় এক জেলেকে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনাকে তারা অভ্যুত্থানের পর প্রথম সন্দেহভাজন ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা গুমের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
এইচআরডব্লিউর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাতের দিকে সুন্দরবন সংলগ্ন মংলার জয়মণির ঘোল এলাকায় জেলে মিরাজ শেখকে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আটক করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তাকে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান। এরপর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন ১১ এপ্রিল মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরা মংলার দিগরাজে অবস্থিত কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে যান। সেখানে প্রথমে কর্তব্যরত কর্মকর্তারা তাদের জানান, মিরাজ শেখ একটি “অপারেশনে” রয়েছেন এবং বিকেলে আবার আসতে বলেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা বিকেলে পুনরায় সেখানে গেলে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়। তখন তাদের জানানো হয়, মিরাজ শেখকে কখনোই ওই কার্যালয়ে আনা হয়নি এবং তিনি সেখানে ছিলেন না। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিবারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে সর্বশেষ দেখা যাওয়ার পর কোনো ব্যক্তির অবস্থান অস্বীকার করা এবং তার ভাগ্য বা অবস্থান গোপন রাখাই আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা গুমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সংস্থাটির মতে, মিরাজ শেখের ঘটনায় সেই আশঙ্কার সব উপাদানই বিদ্যমান এবং তাই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে অতীতের গুম, গোপন আটক ও নির্যাতনের সংস্কৃতি বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছিল। সরকার আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে যোগ দেয়, গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে এবং অতীতের অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক এই অভিযোগ সেই অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে সতর্ক করেছে এইচআরডব্লিউ।
এইচআরডব্লিউ আরও অভিযোগ করেছে, সরকার সম্প্রতি গুমসংক্রান্ত আইন পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে অপরাধ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, গুমকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি স্বতন্ত্র গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গুমের হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের কাছে ১,৮৫০টিরও বেশি অভিযোগ এসেছে এবং কমিশন ইতোমধ্যে একাধিক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে অতীতের অপরাধের বিচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নতুন কোনো গুমের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনাও সমান জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। যদি মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত না হয়, তাহলে এটি নিরাপত্তা বাহিনীর পুরোনো অপব্যবহার ফিরে আসার আশঙ্কা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে কোনো বাহিনীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সংস্থাটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, মিরাজ শেখের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করতে হবে, তার পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত তথ্য দিতে হবে, সংশ্লিষ্ট কোস্ট গার্ড সদস্যদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর মতে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শুধু অতীতের ঘটনার বিচার নয়, নতুন কোনো অভিযোগও দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা সরকারের আন্তরিকতার প্রকৃত পরীক্ষা। মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ সত্যিই গুমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে কি না।
মন্তব্য করুন