বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—এই দেশের সাধারণ মানুষ সহজে বিশ্বাস করে, আর সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি শক্তি ( বৃহৎ আন্তর্জাতিক শক্তির তাঁবেদার – রাজনৈতিক, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী, এনজিও ও এলিট সিন্ডিকেট) বারবার তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ কি আবারও সেই পুরনো পাতা ফাঁদে পা দিবে?
মার্কিন ও পাকিস্তান ডিপ স্টেট অপারেশনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎখাত পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ বিশেষত মার্কিন ডিপ স্টেটের প্রভাব এবং তথাকথিত “সংস্কার” প্রক্রিয়ার নামে মার্কিন প্রেসক্রিপশনে আগামীকাল অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী ‘গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন’র নামে যে গণতামাশা মঞ্চস্থ হচ্ছে তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
আগামী কয়েক দশক এমনকি শতাব্দী পর্যন্ত তার ভয়াবহ ফলাফল বাংলাদেশের মানুষকে ভোগ করতে হতে পারে। এই অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের শান্তি, স্থিতি ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিএনপি, স্বাধীনতা বিরোধী উগ্র ডানপন্থী জামায়াত ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, জঙ্গি সংগঠন – হিজবুত তাহরির, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফতে মজলিসসহ জঙ্গি উত্থানের প্রেক্ষাপটে ইউনুসের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হলো, তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অতীতের ন্যায় সাময়িক সময়ের জন্য আবারও বিভ্রান্ত মধ্যে আটকে গেছে। চাপিয়ে দেয়া সংস্কার, সিলেক্টেড মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মোড়কে মোল্লা-মিলিটারিতন্ত্রের যৌথ প্রযোজনায় বিদেশি প্রেসক্রিপশন বাংলাদেশের মানুষের গলায় ফাঁস হিসেবে ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে , যা দেশের সংবিধান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
দেশি-বিদেশি ডেভিল নেক্সাসদের যৌথ আয়োজনে ১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত ‘গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন’ আদতে একটি একতরফা, পূর্বনির্ধারিত ও ভুয়া প্রক্রিয়া যেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। নির্বাচন যদি জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া বিশেষত দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (যার জনসমর্থন প্রায় ৫০ শতাংশ) সহ সকল প্রগতিশীল শক্তিকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটিকে নির্বাচন না বলে গণতামাশাই বলা যায়।
শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত ও আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের প্রধান কারণ বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ বিশেষত সাম্প্রতিক গোপন বাণিজ্য চুক্তি ( উচ্চমূল্যে মার্কিন কৃষিপণ্য, জ্বালানি, বোয়িং ও অস্ত্র কিনতে বাধ্য করা) সহ ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সকল বন্দর ও সেন্ট মার্টিনে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের বন্দোবস্ত করা।
এই সাজানো তামাশার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ইসলামী সহ উগ্র ডানপন্থী দলগুলোকে নিয়ে মার্কিন পাপেট মোহাম্মদ ইউনুস ও তার অবৈধ অসাংবিধানিক পরিষদ (যার অনেকে বিদেশি নাগরিক) ও জামায়াত প্রভাবিত সেনাবাহিনী যে নাটক মঞ্চস্থ করছে তা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে কবর দিয়ে মোল্লা-মিলিটারিতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী অপশাসনের পথ প্রশস্ত করবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের আকাঙ্খা হবে সুদূরপরাহত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে রাষ্ট্রগুলোতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দিয়ে মার্কিন মদদপুষ্ট গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে, সেগুলোর পরিণতি কী হয়েছে? আফগানিস্তান, পাকিস্তান, লিবিয়া, ইউক্রেন, সিরিয়া কিংবা ইরাক—সবগুলোই আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রের উদাহরণ, যেখানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ বাংলাদেশকে ঠিক সেই দিকেই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান ও ইউনুসের তত্ত্বাবধানে পূর্বপরিকল্পিত একতরফা নির্বাচনে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান (যিনি দেশে বিদেশে kleptocratic politics এর প্রতীক হিসেবে পরিচিত) কিংবা সংবিধান, নারী ও মুক্তিযুদ্ধি বিরোধী উগ্র ধর্মীয় সংগঠন জামায়াতী ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাস্তবতা হলো ইউনুস–ওয়াকার-তারেক–শফিক তারা সবাই একই মতাদর্শ ও বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক। মাঝে মাঝে তাদের বয়ান আলাদা মনে হলেও বাস্তবে উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন – ক্ষমতা দখল এবং বিদেশি স্বার্থ রক্ষা।
ইউনুস-ওয়াকার-তারেক-শফিক নেক্সাস গত ১৮ মাসে বাংলাদেশে অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জনকে ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছে। এই দুর্বিষহ সময়ে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে নারী, শিশু ও বাংলাদেশের সাধারণ মেহনতী মানুষ। তারপরও তারা যদি এই অবৈধ, ভুয়া ও বাংলাদেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন অর্থাৎ নির্বাচনে ভোট দিতে প্রস্তুতি নেন তবে তারা নিজেরাই নিজেদের দুর্দিন ডেকে আসবেন। শুধু নিজেরাই নয়, তাদের এই সিদ্ধান্তের দায় দেশের অধিকাংশ জনগণকে ভোগ করতে হবে। ইতিহাস কখনো কাউকে ক্ষমা করে না—আজ যারা এই নাটকের অংশীদার হবেন, আগামী দিনে তারাই ইতিহাসে কলঙ্কিত হিসেবে বিবেচিত হবেন।
বাংলাদেশের মানুষকে আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে – আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি, নাকি আবারও বিদেশি শক্তির পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছি?
Mark my words for the future. The darkest days are coming for all in Bangladesh. If the US is your friend, then you don’t need any other enemies.
আজ সিদ্ধান্তের সময় – হয় আমরা নিজেদের ইতিহাস, সংবিধান, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব, নয়তো আবারও ধোঁকা খেয়ে একটি অনিশ্চিত, অস্থিতিশীল ও ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাব। নির্বাচন নামক আগামীকালের সাজানো গণতামাশাকে প্রত্যাখ্যান করুন। তা না হলে ভয়াবহ পরিনতির দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না।
মন্তব্য করুন