শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দলীয় নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। রয়টার্স-এর এই রিপোর্টের পরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছে। এখন সামাজিক মাধ্যমে চলছে সাক্ষাৎকারটির কাটাছেঁড়া।
এর মধ্যে রুচিহীনতা দেখিয়েছে ‘ডেইলিস্টার’, ‘প্রথমআলো’, ‘মানবজমিন’। প্রথম আলো এবং মানবজমিন নিউজটি রয়টার্সের বরাতে ছেপেছে, অথচ ছবি ব্যবহারের সময় রয়টার্সেরটা বাদ দিয়ে নিজেদের ঘৃণা প্রকাশের নমূনা রেখেছে। মানবজমিন এবং প্রথম আলোর এত ঘৃণা কেন সে প্রশ্ন অবান্তর। কিছুদিন আগেই মতিউর রহমান স্বীকার করেছেন যে শেখ হাসিনার পতনের জন্য তিনি এবং তারা কাজ করেছেন। এখন ‘প্রথম আলো’ ‘মানবজমিন’ ভয় পাচ্ছে কীনা সেটা বলা মুশকিল।
সাক্ষাৎকার বিষয়ে ফেরা যাক।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে তারা দেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কীভাবে আচরণ করে, সেটিও পরীক্ষা করতে চান।
শেখ হাসিনা প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন,’দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন,”তবুও আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতেই আসুক যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছে।”
মূল সাক্ষাৎকার এতটুকুই। এর সঙ্গে সম্পূরক হিসাবে এসেছে তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণায় ভারতের বক্তব্য। সেখানে বলা হয়েছে; “তাঁর দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে, কারণ ভারত তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে।”
তিনি দেশে ফেরা বা কবে ফিরবেন এ বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। এই প্রথম তিনি দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সীমা উল্লেখ করলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। তারা বারবার ভারতকে চিঠি পাঠাচ্ছে আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য। কিন্তু আমি নিজেই দেশে ফিরব।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারের মুখপাত্ররা রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি।
এখানেই মূলত সাক্ষাৎকার শেষ। এর পর রেগুলেশন হিসাবে ২০২৪-এ কথিত অভ্যুত্থান, তাতে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের চালবাজী, শেখ হাসিনাকে ফেরৎ চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের ইদুর-বেড়াল খেলা, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অপরাধ, তার বিচার, সাজা ইত্যাদি রয়েছে।
এখন মিলিয়ন ডলারের কোশ্চেন হলো তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বলছিলেন, ‘এ বছরের মধ্যেই দেশে ফিরবেন’। এবার নির্দিষ্ট করে মাসের নাম এবং ফেরার পদ্ধতি বললেন কেন? সত্যি সত্যিই ফিরবেন সেটা কী? নাকি ফেরার ঘোষণা দিয়ে সরকারে অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানালেন?
অনেকেই বলছেন, ‘তিনি যে প্রকৃতির মানুষ তাতে যা বলেন তা করে ছাড়েন। সুতরাং তিনি যেহেতু মাস নির্দিষ্ট করে বলেছেন, সেহেতু তিনি ফিরবেনই। ফেরার পর কী কী হতে পারে তাও বলেছেন অনেকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে; বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থায় যে কোনো সরকারকেই ভারতকে গুণে চলতে হবে। ভারতের বিরুদ্ধাচারণ করে কিংবা বিরাগভাজন হয়ে কেউ সরকারে থাকতে পারবে না। তার মানে ভারত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পর তাঁর নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে দেখবে। সে কারণে বিএনপি সরকার চাইলেই তাকে ‘ক্যাঙ্গারুকোর্টের’ মাধ্যমে দেওয়া শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। আদালতকেও আজ্ঞাবহ করতে পারবে না।
আমি জানি না এই আশ্বাস তারা কোথা থেকে পান? এই উপমহাদেশের ইতিহাসেই এধরণের ঘটনার করুণ পরিসমাপ্তি আছে। পাকিস্তানে জেনারেল জিয়া-উল-হক ক্ষমতা দখল করে বিভিন্ন অপরাধে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে গ্রেফতার এবং বিচার করে। আদালত ভুট্টোকে ফাঁসির আদেশ দেয়। ফাঁসি মওকুফের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশেষ করে সৌদি আরব জোরালোভাবে অনুরোধ করেছিল ফাঁসি কার্যকর না করতে। কিন্তু জিয়া কারও কথায় কর্ণপাত করেননি। নির্দিষ্ট দিনেই ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর করেছিলেন। এর পর পাকিস্তানজুড়ে কত বড় মিছিল-মিটিং হয়েছিল, কত মানুষ হাহাকার করে কেঁদেছিল, কতদিন দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি সেই বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে কিন্তু ম্যাটার করেনি। জিয়ার শাসনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেনি। মানুষ একসময় সব ভুলে গেছে।
ঠিক এই ঘটনাটিই যদি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি হোক বা জামায়াত, যে-ই সরকারে থাকুক ভারতকে সমীহ করেই চলতে হবে। চলে এবং চলবেও। তার মানে এই নয় যে ‘চির শত্রু’কে চির দিনের জন্য শেষ করে চির দিনের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক করার এই সুযোগ বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি হাতছাড়া করতে চাইবে।
ভারতকে আমলে রাখলেও তাদের পেছনে আছে আমেরিকার বলিষ্ঠ সমর্থন। সেই সঙ্গে আছে তথাকথিত মুসলিম বিশ্বের, বিশেষ করে স্বঘোষিত খলিফা টার্কিয়ের এরদোয়ানের এবং নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের সিপাহসালার ভাবা পাকিস্তানের প্রচ্ছন্ন সমর্থন। প্রবল গণবিক্ষোভ, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুরসহ দেশ অচল করে দেওয়ার মত কিছু যদি ঘটেও সেটা সাময়ীক কেননা আওয়ামী লীগ গত দুই বছরে যে পরিমান মার খেয়েছে তার এক শতাংশও প্রতিরোধ-প্রতিশোধ দেখাতে পারেনি। কেন পারেনি সেটা ভিন্ন রাজনীতিহীনতার প্রসঙ্গ।
তবে শেষে যে ট্যুইস্ট রয়েছে সেটাই এই সাক্ষাৎকারের নির্যাস। তিনি কবে দেশে ফিরবেন, কবে আত্মসমর্পণ করবেন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা নির্দিষ্ট করে জানাননি। তার বদলে বলেছেন- ‘আমি বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রাখি। বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে আদালতের প্রক্রিয়া কতটা প্রহসনমূলক। আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’
এখানে অবশ্য একটি বিষয় হিডেন থেকে যায়। বিচারিক আদালত সম্পর্কে গত দুই বছরে যে সব অনিয়ম, বিচারহীনতা, সরকারের আদেশের বাস্তবায়ন হয়েছে তার পরও শেখ হাসিনা সেই বিচারিক আদালতের ওপর ভরসা রাখছেন কার ভরসায়? আপাতত এই বিষয়টি হিডেন আছে, হিডেনই থাকুক।
তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন; “দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের গোপন যোগাযোগ হয়নি। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার কিংবা বিচার—এসব বিষয় কোনো গোপন আলোচনার বিষয় হতে পারে না। কারাগারে যেতে তিনি ভয় পান না কারণ, অতীতেও তিনি একাধিকবার কারাবন্দি হয়েছেন।”
এই কথাটি বলে তিনি কার্যত দেখিয়ে দিতে চাইছেন যে দেশে বিটএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়নি। তার মানে হলো সমঝোতা হতে পারে মর্মে আভাস মেলে।
এরপর তিনি বলেছেন,”কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”
এই শেষ কথাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আই রিপিট-এটাই সিগনিফিকেন্ট। তিনি কোন পক্ষকে দিয়ে কোন পক্ষকে নিবৃত্ত করছেন, কোন শক্তিকে দিয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অসার প্রমাণ করতে চাইছেন, কোন আন্তর্জাতিক শক্তি তাঁর পেছনে সমর্থন ও সাহস যোগাচ্ছে সেটা কেবল তিনি এবং তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন জানেন। তবে “একটি সরকারের ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।” কথাটা নির্বাচনকালিন কথা। অর্থাৎ পরবর্তী নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ থেকে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বার ব্যবহৃত হবে সেই কথাটিই এটা। এবং বিস্ময়করভাবে তা এখনই ঘোষিত হলো।
আর এটা থেকেই অনুমিত হয় তিনি আসছেন এবং স্বাভাবিকভাবে রাজনীতিতে ফিরছেন। আমরা জানি না ২৪-এর ৫ আগস্ট তাঁকে বহনকারী বিশেষ বিমানের ক্রুদের বর্তমান স্ট্যাটাস কী? তবে অনুমান করা যায় তিনি অন্য কারও ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আসবেন না। যেভাবে গিয়েছেন হয়ত সেভাবেই ফিরবেন।
10th July 2026
মন্তব্য করুন