ডেস্ক রিপোর্ট:
দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ মহামারি চললেও যেন তা আর আলোচনার বিষয় নয়। একের পর এক শিশুর মৃত্যু ঘটলেও জাতীয় আলোচনায় বিষয়টি কার্যত হারিয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সমসাময়িক ইস্যুর আড়ালে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ধামাচাপা দিতেই হামের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছে। এমনকি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর ওপরও এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশে অনানুষ্ঠানিক চাপ রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে শত শত শিশু, আর নিভে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণ। মায়ের কোল খালি হওয়ার মিছিল থামছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ জুলাই প্রকাশিত নিয়মিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে।
যদিও সরকারের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে পরীক্ষায় হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—যেসব শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে, তাদের মৃত্যুকে পরিসংখ্যানের বাইরে রেখে কি প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হচ্ছে?
প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১২৮ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ৯০১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মাত্র একদিনেই আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৯ জনে পৌঁছেছে।
১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৩ হাজার ৩২৬ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে, আর ১ লাখ ৯ হাজার ৮৯৯ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে ৯২ হাজার ৮৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে ৮৯ হাজার ২৩৪ জন হাসপাতাল ছেড়েছেন, কিন্তু নতুন রোগী আসার প্রবণতা এখনো থামেনি।
টিকা সংকট ও স্বাস্থ্যখাতের পরিকল্পনা স্থগিতের অভিযোগ
সমালোচকদের অভিযোগ, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্যখাতে পূর্ববর্তী সরকারের গৃহীত পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) স্থগিত করার পর থেকেই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একের পর এক সংকট দেখা দেয়।
তাদের দাবি, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়া, টিকা সরবরাহে অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
দুই মাস পেরোল, সংক্রমণ কমেনি—টিকার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন টিকার কার্যকারিতা নিয়ে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, হামের টিকা দেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার প্রায় নয় সপ্তাহ পরও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী।
এই পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যবিদরা প্রশ্ন তুলছেন—টিকা কি যথাযথভাবে কাজ করছে?
অভিযোগ রয়েছে, টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাই করার সুপারিশ বহুবার করা হলেও সরকার এখন পর্যন্ত সে উদ্যোগ নেয়নি।
শতভাগের বেশি টিকাদান, তবুও কমেনি মৃত্যু
হামের বিস্তার ঠেকাতে গত ৫ এপ্রিল উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ উপজেলাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ২০ এপ্রিল তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়।
সরকারের লক্ষ্য ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার ৯৫০ শিশুকে টিকার আওতায় আনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি অনুযায়ী, ১২ মে শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়। আর ২০ মে পর্যন্ত দুই কোটি ২৪ হাজার ১১৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এত বড় সফলতার দাবি সত্ত্বেও সংক্রমণ ও মৃত্যু কেন কমছে না?
টিকার মান ও কোল্ড চেইন নিয়েও প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা দেওয়া নয়—টিকার গুণগত মান, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং কোল্ড চেইন ঠিক ছিল কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের ইপিআই কর্মসূচি ও আইসিডিডিআর,বিতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকাদান কর্মসূচি শুরুর দুই মাস পরও উচ্চ সংক্রমণ উদ্বেগজনক।
তার মতে, এখন জরুরি ভিত্তিতে বয়সভিত্তিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে তাদের শরীরে আদৌ হামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না।
তিনি আরও বলেন, শুধু অ্যান্টিবডি তৈরি হলেই হবে না, সেটি রোগ প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট মাত্রায় রয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডা. তাজুল ইসলাম জানান, ছয় থেকে নয় মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে হামের টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৫০ শতাংশ, নয় মাস থেকে দেড় বছর বয়সে প্রায় ৮৫ শতাংশ, আর চার থেকে ছয় বছর বয়সে প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে বয়সভিত্তিক মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনভাবে টিকা পরীক্ষা করার দাবি
বিশেষজ্ঞরা জাতীয় কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে টিকার মান পরীক্ষা, পরিবহন ব্যবস্থার কোল্ড চেইন যাচাই এবং প্রয়োজন হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় অতিরিক্ত পরীক্ষারও দাবি জানিয়েছেন।
ডা. তাজুল ইসলাম এ বারীর ভাষায়, যদি পরিবহন বা সংরক্ষণে কোথাও ত্রুটি ঘটে থাকে, তাহলে সেটিও শনাক্ত করা জরুরি। অন্যথায় শিশুমৃত্যুর এই মিছিল থামানো কঠিন হবে।
সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, টিকাদানের নয় সপ্তাহ পরও যখন নিয়মিত সংক্রমণ হচ্ছে, তখন টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতেই হবে।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, শতভাগ টিকাদানের দাবি থাকলেও হয়তো কোনো জনগোষ্ঠী টিকার বাইরে থেকে গেছে। আবার টিকার কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ স্বীকার করেছেন, বিষয়টি তাদের বিবেচনায় রয়েছে। তিনি বলেন, সংক্রমণ কমে আসবে—এমনটাই আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
প্রশ্নের মুখে সরকারের প্রস্তুতি
এদিকে প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো টিকার কার্যকারিতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা অ্যান্টিবডি পরীক্ষার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো জাতীয় উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—যখন মৃত্যুর সংখ্যা ৭৫০ ছাড়িয়েছে, সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং টিকাদানের পরও রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সংকটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কেন বিলম্ব হচ্ছে?
শিশুমৃত্যুর এই দীর্ঘ মিছিল এবং টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব না আসা পর্যন্ত দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন