ডেস্ক রিপোর্ট:
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজধানীতে পরীক্ষার্থীদের টানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টার বিক্ষোভের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন—পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন মোকাবিলায় কেন আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হলো।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ, দোয়েল চত্বর এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জড়ো হতে থাকেন শত শত এইচএসসি পরীক্ষার্থী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের পরিধি ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
দুপুর নাগাদ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বিজিবির সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। একই সঙ্গে পুলিশও অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে।
তিন দফা দাবিতে উত্তাল পরীক্ষার্থীরা
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে বহু পরীক্ষার্থী নির্ধারিত কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সংকটময় পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে সংবেদনশীল আচরণ করার পরিবর্তে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য ঘিরেও ক্ষোভ
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে—যা তাদের মর্যাদাহানিকর এবং অপমানজনক। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে তাদের অনুভূতিকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান অপরিবর্তিত
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়ে দিয়েছে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ছাড়া দেশের অন্য সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের এই অবস্থান ঘোষণার পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়েই কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে যারা দুর্যোগের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
বিজিবি মোতায়েনে নতুন প্রশ্ন
পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশের মতে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের পরিবর্তে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিজিবি মোতায়েনের পর এলাকায় এক ধরনের চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণে সড়কে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে।
সরকারের ব্যাখ্যার অপেক্ষা
বিজিবি মোতায়েনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কত সময় পর্যন্ত বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পরবর্তী পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
অভিভাবকদের উদ্বেগ
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। পরিবর্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, দুর্যোগের সময় পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যাতায়াতের সক্ষমতা এবং মানসিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি নাও হতে পারত।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?
শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারও এখন পর্যন্ত পরীক্ষার সূচি পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
ফলে শিক্ষা প্রশাসন ও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থা আগামী দিনগুলোতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেও নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন