ডেস্ক রিপোর্ট:
ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং নিজের নির্বাসিত জীবন নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে তিনি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়নই করেননি; বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য, নিজের দেশে ফেরার পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার ঘোষণা
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই শেখ হাসিনা দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, চলতি বছরের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। তাঁর ভাষায়, দেশে ফেরা তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ।
তিনি বলেন, নানা বাধা, ষড়যন্ত্র এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা অতীতেও তাঁকে থামাতে পারেনি। এবারও কোনো প্রতিবন্ধকতা তাঁর দেশে ফেরার সংকল্পকে দুর্বল করতে পারবে না।
আওয়ামী লীগের শক্তি জনগণের মধ্যে
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের প্রকৃত শক্তি কখনোই রাষ্ট্রক্ষমতা বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিল না। দলটির শক্তির মূল উৎস বাংলাদেশের জনগণ।
তাঁর মতে, ৭৭ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে, দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে, অসংখ্য নেতা-কর্মী জীবন দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতে দলটি আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি দাবি করেন, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা মামলা দিয়ে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও জনগণের হৃদয় থেকে তাকে মুছে ফেলা যায় না।
বর্তমান বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি দাবি করেন, দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে, আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলে বলেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।
অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক তুলে ধরে দাবি করেন, বাংলাদেশ একসময় উচ্চ প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির আন্তর্জাতিক উদাহরণে পরিণত হয়েছিল। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের মূলনীতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান
শেখ হাসিনার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। এই রাষ্ট্রচরিত্র অক্ষুণ্ন রাখাই দেশের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ দুর্বল হয়ে গেলে শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, জাতীয় পরিচয়েরও সংকট তৈরি হয়। তাই তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংবিধানের মৌলিক নীতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শের অংশ হিসেবে উল্লেখ
সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা।
শেখ হাসিনা বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপরাধ নয় শুধু, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনার ওপর আঘাত।
তিনি দাবি করেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া কিংবা অন্য যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষ যেন সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
তাঁর ভাষায়, যে রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নাগরিক ভীত হয়ে জীবনযাপন করেন, সেই রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।
পররাষ্ট্রনীতিতে বঙ্গবন্ধুর নীতির পুনরুল্লেখ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারের নীতি সবসময়ই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংবিধানের মূলনীতিকে অক্ষুণ্ন রেখেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তির ভিত্তি হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র, স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জনগণের আস্থা।
নির্বাসনের জীবন, ব্যক্তিগত বেদনা ও শেষ লড়াইয়ের অঙ্গীকার
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে শেখ হাসিনা নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বলতে তেমন কিছু নেই। ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানোর স্মৃতি এবং পরবর্তী নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বারবার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
বর্তমানেও দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাঁর মন সবসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছেই রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রতিদিন তিনি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
সবশেষে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সংগ্রাম ক্ষমতার জন্য নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই সংগ্রামে অবিচল থাকবেন বলেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
মন্তব্য করুন