ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশের সাবেক সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা, গ্রেফতার, কারাবন্দি জীবন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের জাতীয় সংসদগুলোর সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) আওয়ামী লীগের ছয়জন সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। সংস্থাটি এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিশোধমূলক আচরণ এবং সুসংগঠিত রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
এ নিয়ে আইপিইউ ইতোমধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক অধিবেশনে আলোচনা করেছে এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করায় সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
বিশ্ব সংসদগুলোর ফোরাম আইপিইউর উদ্বেগ
১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) বিশ্বের জাতীয় সংসদগুলোর সবচেয়ে পুরোনো এবং প্রভাবশালী বহুপাক্ষিক সংগঠনগুলোর একটি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সংসদীয় জবাবদিহিতা এবং আইনশাসন রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে সংস্থাটি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আইপিইউর ২১৬তম অধিবেশন এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ২১৭তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সাবেক সংসদ সদস্যদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা হয়। উভয় অধিবেশনেই সর্বসম্মতিক্রমে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রস্তাব গৃহীত হয়।
আইপিইউর তদন্ত ও পর্যালোচনায় চারটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এগুলো হলো— রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বিচারে গ্রেফতার ও আটক, কারাগারে অমানবিক পরিবেশে রাখা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতার অভাব।
ছয় সাবেক সংসদ সদস্যের ঘটনা আন্তর্জাতিক আলোচনায়
আইপিইউর প্রতিবেদনে যাদের বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
তাদের একজন সাবির হোসেন চৌধুরী, যিনি একসময় আইপিইউর অনারারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে তার বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে অক্টোবর মাসে গ্রেফতারের পর আদালতে নেওয়ার পথে তিনি জনতার হামলার শিকার হন। বর্তমানে জামিনে থাকলেও তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩০টি মামলা চলমান রয়েছে। গুরুতর শারীরিক আঘাতের কারণে বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সে সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আইপিইউর মানবাধিকার কমিটির সাবেক সভাপতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরেও তার পরিচিতি রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন কারাবন্দি অবস্থায় তিনি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাতের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তার বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
সাবেক সংস্কিমন্ত্রী ও জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূরের গ্রেফতার এবং বিচারিক প্রক্রিয়াও আইপিইউর নজরে এসেছে। তার শারীরিক অসুস্থতা, পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সীমাবদ্ধতা এবং জামিনসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং মোহাম্মদ ফারুক খানের বিষয়েও চিকিৎসা, আটকাবস্থা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
শতাধিক সাবেক এমপির বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে প্রশ্ন
আইপিইউর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সাবেক সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দায়ের হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিযোগে একাধিক হত্যা মামলা বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় একশোর বেশি সাবেক সংসদ সদস্য একই ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইউনূস সরকারের সময় তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ
আইপিইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্থাটি বিচারিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য একজন স্বাধীন ট্রায়াল অবজারভার নিয়োগ করেছিল। কিন্তু ওই পর্যবেক্ষককে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য ভিসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আইপিইউর দাবি, নিউইয়র্কে সংস্থাটির মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকে তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে বাস্তব ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিএনপি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আইপিইউ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আইনের শাসন ও বিচারিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরলেও আইপিইউ সন্তুষ্ট হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর গত ৩০ এপ্রিল আইপিইউর মহাসচিব মার্টিন চুঙ্গং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। সেখানে বন্দিদের চিকিৎসা, মামলার অগ্রগতি এবং বাংলাদেশ সফরের জন্য আইপিইউ প্রতিনিধিদলকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
প্রশাসনের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক তৎপরতা
আইপিইউর চিঠি পাওয়ার পর জাতীয় সংসদ সচিবালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ইউনিটগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে ছয় সাবেক সংসদ সদস্যের মামলার অবস্থা, আটকাবস্থা এবং আইপিইউ প্রতিনিধিদলের সম্ভাব্য সফর বিষয়ে মতামত চেয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরও দেশের বিভিন্ন জেলা পুলিশ সুপার ও থানার কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি
আগামী অক্টোবর মাসে তানজানিয়ার আরুশায় অনুষ্ঠিতব্য আইপিইউর ১৫৩তম অ্যাসেম্বলিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হবে। সেখানে আইপিইউর মানবাধিকার কমিটি ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামনে বাংলাদেশের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, যদি আইপিইউ মনে করে যে অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত হচ্ছে না বা সরকার সহযোগিতা করছে না, তাহলে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউনূস সরকারের সময় সহযোগিতা না করার অভিযোগ এবং বর্তমান তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক চাপ—উভয় বিষয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। সমালোচকদের মতে, একদিকে মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক তদন্তে বিলম্ব—দুই সরকারের আমলেই বিষয়টি কার্যকরভাবে সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশ অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপে পড়েছে।
আরও অভিযোগ আসছে আইপিইউতে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইতোমধ্যে বিগত সংসদের আরও প্রায় ৫০ জন সাবেক সংসদ সদস্য আইপিইউতে পৃথক অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এসব অভিযোগও প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।
ফলে আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। আইপিইউর প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকার কী ধরনের ব্যাখ্যা ও তথ্য উপস্থাপন করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করবে—তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ভবিষ্যৎ আলোচনা।
মন্তব্য করুন