ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া প্রায় দুই বছর ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ রয়েছে। দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্প্রতি আশার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে দ্রুত কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। বরং সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও ইউনূস সরকার, পরবর্তীতে তারেক সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে কার্যকর কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকের পরও শ্রমবাজার খোলার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা কার্যকর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। বরং একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা এবং নতুন কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনও দূরের বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউনূস-তারেক সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কথা বললেও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার বদলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
বাংলাদেশ প্রতিবছর বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল লাখো পরিবার রয়েছে। অথচ প্রায় দুই বছর ধরে মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী পাঠানো বন্ধ থাকায় হাজার হাজার সম্ভাব্য শ্রমিক কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাবে। এর আগে যদি কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে সমঝোতা সংশোধন করা না যায়, তাহলে নতুন এমওইউ স্বাক্ষরের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। এতে শ্রমবাজার চালু হতে আরও দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। অথচ সরকার এখন পর্যন্ত শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করার কথা বলেছেন। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, শুধু অনুরোধের রাজনীতি দিয়ে কি শ্রমবাজার খোলা সম্ভব? বিগত মাসগুলোতে সরকার কী ধরনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের জন্য এ বাজার বারবার বন্ধ ও চালুর চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। ২০০৯ সালে বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে চালু হয়, আবার ২০১৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে পুনরায় চালু হলেও ২০২৪ সালের মে মাসে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে সেই স্থবিরতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন সরকারের অধীনে পরিস্থিতির উন্নতি কোথায়?
জনশক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারের উচিত ছিল দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মালয়েশিয়ার সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও শ্রমবাজার খুলতে না পারা সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশের লাখো বেকার যুবক, যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছিলেন, তারা এখন হতাশার মধ্যে রয়েছেন।
এদিকে শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী ও অস্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মালয়েশিয়াও এসব অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সিন্ডিকেট ভাঙার নামে শ্রমবাজার পুরোপুরি বন্ধ রেখে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মাধ্যমে বাজার সচল রাখার পাশাপাশি অনিয়ম দূর করা উচিত ছিল।
শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগ, স্বচ্ছ নিয়োগ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু ইউনূস সরকার ও তারেক সরকারের কর্মকাণ্ডে এখন পর্যন্ত সেই ধরনের সমন্বিত কৌশল দৃশ্যমান নয়।
সব মিলিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের আশাবাদী বক্তব্য থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। কর্মী পাঠানো এখনও বন্ধ, নতুন সমঝোতা বা সংশোধিত চুক্তি এখনও হয়নি, আর লাখো সম্ভাব্য কর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে এটি ইউনূস-তারেক সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। সরকার যত দ্রুত কার্যকর ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিতে পারবে, তত দ্রুত এ সংকট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
মন্তব্য করুন