HMI
২১ জুন ২০২৬, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

উত্তরপাড়ায় ‘ওয়াজ-মাহফিলের তাবু’ সেই বাহাত্তরেই টাঙানো হয়েছে!

মনজুরুল হক

অনেকেই খুব অবাক হয়েছেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের আকস্মিক পাক্কা ধর্মীয় গেটআপ দেখে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রচণ্ড ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি জেনারেলদের ৯৯ ভাগই এই গেটআপের বাইরে। যা হোক একজাম্পল দেওয়ার জন্য ইরান আছে। সেনাবাহিনীতে ১৯৭২ সালের পর যেদিন থেকে পাকিস্তান ফেরৎ রিপ্যাট্রিওটিক অফিসাররা কো-অপ্ট হয়েছে, সেদিন থেকেই সেনাঅভ্যন্তরে ধর্মীয় জজবা বিকশিত হতে শুরু করেছে।


গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করে ডিপস্টেট প্রজেক্টের সিআইএ, পাকিস্তানের আইএসআই, দীর্ঘদিনের ডিপস্টেটের এজেন্ট মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসানোর পর থেকেই সেনাঅভ্যন্তরে এই র্যাডিক্যাল চেঞ্জেসগুলো প্রকট হতে থাকে।


শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে ডিপস্টেট-এর এজেন্ট ইউনূস ইন্টেরিম সরকারপ্রধান হয়ে বসার পর ল’ এন্ড অর্ডার, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। ইন্টেরিম প্রধান ইউনূসের অধীনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি মাঠে রয়েছে। দুমাস পর পর তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারে মাঠে রাখা নবায়ন করা হচ্ছে। এই সময়ে একাধিকবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনীকে দিয়ে ‘পুলিশি দায়িত্ব পালন’ করানো বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি কয়েকবার সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, সেনাবাহিনীকে দীর্ঘদিন পুলিশি ভূমিকা পালন করালে তাদের প্রফেশনাল ক্যাপাবিলিটি ডেস্ট্রয় করতে পারে। বার বার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা তাদের সেনা শৃঙ্খলাও নষ্ট করে দিতে পারে। ওয়াকারের এই স্টেটমেন্ট ইন্ডিকেট করে যে বাংলাদেশের পলিটিক্যাল ইন্ট্রিগ্রিটি ভালনারেবল। ওয়াকার বার বার সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে ‘প্রফেশনাল ক্যাপাবিলিটি’ শব্দটি ব্যবহার করছেন কেন? এটাই এই লেখার অন্তর্নিহিত বক্তব্য।


বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাটলে দেখ যাবে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে যে ডিপস্টেট পরিচালিত, সিআইএ অভিনীত সিভিকোমিলিটারি ক্যু ঘটিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে, সেটাই ইতিহাসে প্রথম নয়। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একাংশ (দায় এড়ানোর জন্য বলা হয়-‘কতিপয় পথভ্রস্ঠ সেনা সদস্য’) দেশটি স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হ/ত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে।


অর্থাৎ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দলখ করার কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৭৫, ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৮২, ২০০৬, ২০২৪ সব এক সূতোয় বাঁধা। কি ঘটেছে সেটা জানা গেলেও আগামীতে কি ঘটতে যাচ্ছে সেটা কারও জানা নেই। তার বড় প্রমাণ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইউনূসের অধীনে সাজানো নির্বাচন হয়ে নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সাড়ে তিন মাস পেরুলেও সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফেরেনি। কবে ফিরবে কেউ জানে না।


মাঠে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকার পরও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইউনূসের মবক্রেসির মতই রয়ে গেছে। এসএসএফ থাকার পরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা দিচ্ছে বেরকারি একটি অ্যামেচার প্রতিষ্ঠানের প্রহরীরা। সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ওয়াকার-প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন ভিন্ন সুরে বক্তব্য দিচ্ছেন। পুলিশের মনবল ফেরানোর জন্য সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে। এবার সেনাবাহিনীকে মোটিভেট করার জন্য বিজিবিকে মোতায়েন করা হয়েছে।


বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর পলিটিসাইজ হওয়ার ঘটনাক্রমঃ
১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রিয়েশন হওয়ার সময় মনে করা হয় দেশের প্রায় ষাট থেকে সত্তর ভাগ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছিল। পাশাপাশি প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধুর সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কো-অপ্ট করে। অবশিষ্ট অংশ নিয়ে গঠিত হয় ‘মুজিব বাহিনী’। যা পরবর্তীতে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী বা ‘রক্ষীবাহিনী’ নামে গঠিত বাহিনীতে কো-অপ্ট করানো হয়।


যে সেনাদের নিয়ে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাদের সবার নিয়োগ, ট্রেনিং, বিকাশ, প্রমোশন সব পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকারের গড়ে দেওয়া আদলে হয়। সেসময় সকল অফিসারদের ট্রেইনিং হতো ইসলামাবাদের কাকুলে। আদ্যোপান্ত পাকিস্তানি চিন্তা-চেতনায় গড়ে ওঠা সেনাদের সঙ্গে কোনোভাবেও মানিয়ে নিতে পারছিল না মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে লড়াই করে আসা ছাত্র-যুবারা।


এসময় সেনাদের ভেতরে জোর প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয় যে শেখ মুজিব পুরোপুরি ভারতপন্থী। তিনি আজ হোক বা কাল সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে রক্ষীবাহিনীকে মূল বাহিনী করবেন। পাকিস্তানে ট্রেইনিং পাওয়া, পাকিস্তানের মানসিকতায় গড়ে ওঠা সেনা সদস্যদের ভেতর ভারতবিরোধীতা দিন দিন তীব্র হতে থাকে। সেসময় গঠিত ‘জাসদ’ও এই প্রপাগান্ডায় বাতাস দিতে থাকে। এরকম একটি মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিল ডিপস্টেট, সিআইএ। তারা একাত্তর সালে যেটা পারেনি রাশিয়ার প্রতিরোধে, এবার সেটা করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। শেখ মুজিবের পরিবারের সদস্যদের ওপর চুরি-ডাকাতির অভিযোগ, সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়ার প্রপাগান্ডা, রক্ষীবাহিনীর অধীনে সেনাবাহিনীকে অকুপাই করে ফেলা এবং বাংলাদেশকে ভারতের করদ রাজ্য বানানোর ‘মুজিব-ইন্দিরা ষড়যন্ত্র’ বলে সেনাবাহিনীর একাংশকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হ/ত্যা করে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহনী। ক্ষমতা দখল করেই তারা মার্কিন প্রভুভক্ত চাকর খন্দকার মোশতাককে পুতুল হিসাবে ক্ষমতায় বসায়। এই সংকট থেকে তৎকালিন জেনারেল খালেদ মোশাররফ পাল্টা ক্যু করা চেষ্টা করে ব্যর্থ হন এবং প্রাণ হারান।


পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আইন প্রশাসকের খোলস ছেড়ে পাকাপাকিভাবে পলিটিক্যাল উচ্চাভিলাস নিয়ে হাজির হন। তিনি সরাসরি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গঠন করেন। পাকিস্তানি মাইন্ডসেটের জিয়া বরাবরই পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে এসেছেন। তিনি এতটাই পাকিস্তানি মাইন্ডসেটের ছিলেন যে সাবলীলভাবে বাংলাও বলতে পারতেন না। সাবলীল ছিলেন উর্দু ও ইংরেজিতে।

১০
জিয়া ক্ষমতায় আসার ফলে সেনাবাহিনীতে পাকিস্তানি মাইন্ডসেটধারারীদের ক্ষমতা সংহত হতে থাকে। সেনাবাহিনীতে যারা পাকিস্তানি ভাবাদর্শের লোক ছিলেন তারা এবার সমবেত হয়ে আরও শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। তা স্বত্ত্বেও সেনাবাহিনীতে যে কিছু সংখ্যক মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের তথা বঙ্গবন্ধুর পক্ষের সদস্য ছিলেন তাদের উপর নেমে আসে জিয়ার অত্যাচার, নিপীড়ন। সেই সাপ্রেশন এতটাই তীব্র ছিল যে প্রায় প্রতিদিনই সেনাঅভ্যন্তরে ক্যু-পাল্টা ক্যুদেতার মত পরিস্থিতি চলছিল। এরই মধ্যে জাপান এয়ার লাইনস-এর একটি বিমান হাইজ্যাকড হয়ে ঢাকায় অবতরণ করলে সেটাকে কাজে লাগিয়ে জিয়া বিমান বাহিনীতে এক ব্লাডশেড ঘটায়। যার ফলে কয়েক শ’ এয়ারফোর্স অফিসারের মৃত্যু ঘটে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে জিয়া তার শাসনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি দিনের জন্যও রাতের কার্ফিউ শিথিল করেননি।

১১
জিয়ার শাসনাবসান হয় আর এক রক্তাক্ত সামরিক ক্যুদেতার মাধ্যমে। যার নেপথ্যে ছিলেন আর এক উচ্চাভিলাসী পাকিস্তান ফেরৎ জেনারেল এইচ এম এরশাদ। তিনি একটি সামরিক গ্রুপকে দিয়ে জিয়াকে সরিয়ে নিজেই নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯১, এই টানা ৯ বছর এরশাদ প্রথমে সামরিক আইন প্রশাসক, প্ররে প্রেসিডেন্ট হয়ে শাসন করেন। তার আমলেই বাংলাদেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়। তিনিও পলিটিক্যাল ও মিলিটারি ইম্ব্যালান্স সিচ্যুয়েশনকে কাজে লাগিয়ে ‘জাতীয় পার্টি’ নামক দল গঠন করেন।

১২
১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তিনটি বড় দলের অস্তিত্ব ও ভূমিকা যথাক্রমে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাপন্থী প্রো-ইন্ডিয়া পার্টি, জিয়াউর রহমানের বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহারকারী প্রো-পাকিস্তান এবং এরশাদের ‘জাতীয় পার্টি’ প্রো-পাকিস্তান, প্রো মুসলিম সেন্টিমেন্টধারী। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এটা বুঝতে পারে যে রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের অংশগ্রহণ কমে আসলে তার সুফল যাবে মিলিটারি রুলারদের পকেটে। সে কারণে ১৯৮৬ সালের পর ১৫ দল, ৭ দল ও ৫ দলের যুগপত আন্দোলন-সংগ্রামের শুরু। যার শেষ হয় এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে। এর পরের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলেও একটি অ্যামেন্ডমেন্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরে আসে রাজনীতিবিদদের হাতে। খুঁড়িয়ে হলেও চলা শুরু হয় পলিটিক্যাল রেজিমের।

১৩
কিন্তু গুরুতর সমস্যা হলো গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হলে, ক্ষমতাসীন বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে অন্যান্য পলিটিক্যাল অ্যাক্টরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছিল, যে কোনো মূল্যে সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। অথচ এই অ্যাক্টরগুলো ক্ষমতাসীন হয়েই প্রতিপক্ষকে দমন করতে সেই সেনাবাহিনীকেই ব্যবহার করেছে। ফলে সেনাবাহিনী তখনই পলিটিক্যাল এরিনার বাইরে চলে যায়নি বা যেতে পারেনি কিংবা যেতে চায়নি।

১৪
ধারাবহিক ঘটনাবলির এই জায়গাটিতে দেখা যায় বেশ বড়সড় এক বাঁক বা ঘটনাবলির ট্যুইস্ট। ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-আওয়ামী লীগ পালাক্রমে ক্ষমতাসীন হয়ে দুটো শক্তিশালী পলিটিক্যাল অ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। এই একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী তৃতীয় শক্তিশালী পলিটিক্যাল অ্যাক্টর হিসাবে আবির্ভূত হয়। পাকিস্তানে মুসলিম লীগকে শায়েস্তা করতে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ তত্ত্বাবধায়নে ব্রিটিশ-ভারতের লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতে ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ নামে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৯ সালে ঢাকায় একটি কনভেনশনের মাধ্যমে “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ” নামে এটি পুনরায় গঠিত হয়। গঠনের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এরা পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ফ্যাক্টর হিসাবে কাউন্ট হতো না। ১৯৭১ সালে টিক্কা খান জামায়াতকে ফ্রন্টফুটে আনেন। জামাতের ক্যাডারদের দিয়ে আলবদর, আলশামস, রাজাকার গঠন করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যুদ্ধ করা, পাকিস্তানের প্রক্সি হয়ে জল্লাদের ভূমিকা পালন করার মধ্য দিয়ে তাদের উন্মেষ ঘটে।

১৫
এর পর বলার মত শক্তির বিচ্ছুরণ দেখা যায় ১৯৯১ থেকে ২০০৫-৬ সালের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে। এসময় যখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি পালাক্রমে শাসন ক্ষমতায় আসছে, সেসময় খুব মেথোডোলজিক্যাল টেকনিকে জামায়াত তাদের র্যাডিক্যালাইজড ক্যাডারদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পুশ করতে থাকে। যে সেনাবাহিনী জিয়া-এরশাদের আমলে বিপুলভাবে প্রো-পাকিস্তান সেন্টিমেন্ট নিয়ে বীরদর্পে বিকশিত হচ্ছিল, সেই সেনাবাহিনীতে জামাতের র্যাডিক্যাল ক্যাডাররা খুব সহজেই আপ্যায়ীত হতে থাকে, এবং দ্রুত এদের প্রমোশনও হতে থাকে। ২০০৫-৬ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে জামায়াতি ক্যাডারদের ভর্তি করানোর পরে তারা নজর দেয় প্যারা মিলিটারি বাহিনী বিডিআর-এ ক্যাডার রিক্রুমেন্ট করাতে। ২০০৫-৬ থেকে ২০০৮-৯ সাল পর্যন্ত বিডিআর/বিজিবি বাহিনীতে প্রায় ৩৫ শতাংশ জামায়াতী ক্যাডার ঢুকে পড়ে। যার নগ্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় বরইবাড়ি সীমান্তে ভারতের বিএসএফ জওয়ানদের হ/ত্যা করে জীপের পেছনে বেঁধে ধানক্ষেত্রে টেনে-হিচড়ে নেওয়া।

১৬
এর পর ২০০৯ সালে ওয়ান ইলেভেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর পরই এই বিডিআর বাহিনীতে একটি মিউটিনি কাল্টিভেট করানো হয়। তারা সরাসরি শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে মিউটিনি লঞ্চ করে। অজুহাত হিসাবে বলা হয়েছিল ‘আমাদের খাবার নিম্ন মানের, আমাদের জাতিসংঘ পিস কিপিংয়ে নেওয়া হয় না, ‘ডালভাত কর্মসূচি’র টাকার ভাগ চাই…. ইত্যাদি। অথচ সত্য হলো বিডিআর-এ যে জামায়াতি ক্যাডার ছিল তারা পাকিস্তানি আইএসআই-এর অঙ্গুলি হেলনেই বিদ্রোহ করেছিল। সারা দেশের প্রায় অর্ধেক বিডিআর সদস্য রিভোল্ট করে। এর পেছনে যে স্বাধীনতাবিরোধী তথা প্রো-পাকিস্তান সেন্টিমেন্টের কলকাঠি নড়া ছিল এবং সরাসরি আইএসআই এই রিভোল্ট মনিটরিং করেছিল সেটা সে সময়তেও স্পষ্ট ছিল, এখন আরও বেশি করে স্পষ্ট।

১৭
জামায়াত, আইএসআই-এর প্ল্যান ছিল শেখ হাসিনা সরকারকে থিতু হওয়ার সময় না দিয়ে এখনই ফেলে দিতে হবে। সে জন্য বিডিআর মিউটিনি ঘটিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যাতে করে শেখ হাসিনা বিডিআরকে সাপ্রেস করতে সেনাবাহিনীকে বিডিআরের মুখোমুখি করতে বাধ্য হয়। সেটা হলে সেনার ভেতরে জামায়াতি ক্যাডাররা বিডিআরকে সাপ্রেস করার বদলে তাদের সঙ্গে মিলিতভাবে মিউটিনি জোরদার করবে। তাদের প্ল্যান শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি শেখ হাসিনার দুটি ছোট্ট কৌশলগত পদক্ষেপের কারণে। প্রথমত: তিনি বিডিআরের যারা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছিল তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের সমস্যা মনযোগ দিয়ে শুনে সমাধান করবেন বলে আশ্বস্ত করেন, এবং দ্বিতীয়তঃ বিডিআরের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার না করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা ‘র্যাব’ ব্যবহার করে অর্থাৎ সেনাবাহিনীকে মিউটিনি থেকে দূরে রাখার কৌশলে সফল হন।

১৮
এই টেকনিক অ্যাপ্লাই করে সুফল পাওয়ার পর ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা পনের বছর সিভিল-মিলিটারি ব্যালান্স করতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এই পনের বছরে একটিবারের জন্যও মিলিটারি ক্যুদেতার চেষ্টা হয়নি। ২০১১ সালে এক সংশোধনী এনে সামরিক বাহিনী ক্যু করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করলে তা ‘দেশদ্রোহীতা’ বলে বিবেচিত হবে এবং যার শাস্তি-মৃত্যুদণ্ড। এই আইনের ফলে এবং সিভিল-মিলিটারি ব্যালান্স মেইনটেন করার জন্য শেখ হাসিনার আমলে কখনও সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দেয়নি। দিলেও তা ক্যু করার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে এমন এক আপহোল্ড পজিশনে তুলে দিয়েছিলেন যেখানে সেনাবাহিনী কখনও পলিটিক্যাল পার্টিকে সুপারসিড করতে উদ্যত হয়নি। যে কারণে আওয়ামী লীগের কোনো আমলেই মিলিটারি ইন্টারফেয়ারেন্স ছিল না, হয়ওনি।

১৯
সেই মিলিটারি রেজিমকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখাকালিন যে বিপদটি সামনে আসে তা হলো সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রবলভাবে নেপোটিজম চালু হয়। অবস্থা এমনই দাঁড়ায় যে যোগ্যতা বিচারে সিনিয়রদের টপকে ওয়াকার-উজ-জামান সেনাপ্রধান হয়ে বসেন, কারণ তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মিয়! শুধু সেনাপ্রধান নয়, প্রায় সকল সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের প্রমোশন, নতুনদের রিক্রুটমেন্ট, ট্রান্সফার সবই হতে থাকে নেপোটিজমের হাত ধরে। এর ফলে সেনাঅভ্যন্তরে এক ধরণের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

২০
ইতোমধ্যে জো বাইডেন প্রশাসন চীনকে শায়েস্তা করার জন্য ভারত ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি চাইলে ভারত সরাসরি ‘না’ করে দেয় কারণ, ৫০-এর দশকে ভারত একবার আমেরিকাকে ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে হাত পুড়িয়েছে। সেসময় আমেরিকানরা ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তিব্বতে স্যাবোটাজ চালাত দলাইলামাকে ক্ষমতাসীন করার জন্য। যা হোক, ভারত ‘না’ করার পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি লিজ চাইল বাইডেন প্রশাসন। ভারতের মত শেখ হাসিনাও সরাসরি দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাইডেন কবলিত ডিপস্টেট সক্রিয় হতে শুরু করে এবং ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ছাত্র অসন্তোষকে পুঁজি করে কালার রেভ্যুলুশনের নামে রেজিম চেঞ্জ করে দেয় এবং তাদের দীর্ঘদিনের পোষা ভৃত্য ইউনূসকে ক্ষমতায় বসায়। এবারও জিয়া, এরশাদের মত ইউনূসও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপি নামে নতুন কিংসপার্টি গঠন করে। এরা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মত রাতারাতি প্রধানতম পার্টি হতে না পারলেও ক্ষমতা প্রদর্শন, অবৈধ অর্থ আয়ের দিক থেকে বিএনপি-জাপাকে ছাড়িয়ে যায়। এদের বালক নেতৃত্বের দাপট এতটাই বেড়ে যায় যে তারাই যেন ইউনূসকে পরিচালিত করছে!

২১
ইউনূস ক্ষমতায় বসার পর পরই টের পাওয়া যায় এখানে ইউনূস একা নয়, সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন আছে তার সাথে। এরপর সরাসরি সেনাপ্রধানের ভাষণ থেকেও বোঝা যায় তিনি জামায়াতের পারপাস সার্ভ করছেন! একই সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মহত্ত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন, আবার একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি তার আনুগত্য বা সমর্থন প্রকাশ করছেন। এই ‘অ্যাচিভমেন্ট’টাই জামায়াতের সেই আশির দশক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় করা সুচতুর প্ল্যান থেকে এসেছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি ও বাম দলগুলো যখন ক্ষমতা নিয়ে চাপান-উতোর খেলছে, সে সময়ে জামায়াত স্লোলি বাট স্টেডিলি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব-এর ভেতরে নিজেদের র্যাডিক্যাল ক্যাডারদের ভর্তি করাচ্ছে।

২২
২০২৪ সালের ডিপস্টেট গেম-এর পর সেনাদের ভেতের জামায়াতের পুশইন কতদূর বিস্তৃত তার আলামত দেখা গেছে; ৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙেছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য ভেঙেছে তারা সকলেই জামায়াতি রিক্রুটমেন্ট। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে আজকের এই মে মাসের শেষাবধি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যতগুলো ঠান্ডা লড়াই ঘটেছে, যতগুলো গ্রুপিং হয়েছে, পাকিস্তান সফর হয়েছে, জঙ্গীদের ছাড় দেওয়া থেকে শুরু করে মবভায়োলেন্সে নিষ্ক্রিয় থাকা, সবই ঘটেছে সেনাঅভ্যন্তরে জামায়াতী বীজের অঙ্কুরোদগমের ফলে।

২৩
ডিপস্টেটের দালাল উইনূস গিয়ে বিএনপি এসেছে। ইউনূসের বদলে তারেক রহমান এসেছে, কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গতিমুখ সেই যে ইউনূসের সময়ে পশ্চাদমুখি হয়েছিল, এখনও তাইই আছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও সেনারা ব্যারাকে ফেরেনি। এখন শোনা যাচ্ছে সরকার পরিচালনায় সেনারাও সমান্তরালে অংশ নেবে। অনেকটা পাকিস্তানি মডেলের মত। সামনে থাকবে নাম কা ওয়াস্তে বেসামরিক নির্বাচিত সরকার, কিন্তু পেছনে থাকবে শক্তিশালী সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধানের ভূমিকা হবে আসিম মুনিরের মত! পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আদলে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীও প্রায় ৫০টির অধিক বিজনেস সেক্টর পরিচালনা করে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী যদি আক্ষরিক অর্থেই পাকিস্তানি সেনাদের পথে হাঁটে, তাহলে ধরে নিতে হবে; জামায়াত কোনোদিনও ক্ষমতাসীন হতে চাইবে না কারণ, ক্ষমতাসীন না হয়েও তারা ক্ষমতায় আছে। এই শ্যাডো ক্ষমতার কিছু কিছু বিচ্ছুরণ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে এবং হচ্ছে।

২৪
বিশ্ব পরিসরে মিশর, তুরস্কের সেনাবাহিনী মৌলবাদী শক্তির বিরোধীতা করে দেশকে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক করতে লড়াই করে। আর বাংলাদেশে সেনাবাহিনী করতে চাচ্ছে তার উল্টো। যে ধারায় সেনাঅভ্যন্তরে জামায়াতী-হিজবুতি পুশইন চলছে, সেটা অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের র্যাডিক্যাল ইসলামাইজেশন ক্যু ঘটে যাবে, যা ঘটানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজ করে আসছে।

Monjurul Haque

20th June 2026

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনূসের স্বেচ্ছাচারিতা ও তারেকের অবহেলায় হামে এ পর্যন্ত ৮০৩ শিশুর মৃত্যু 

দেশে ফেরার ঝুঁকি আমি জানি: জাপানের কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা

দিল্লিতে মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, রাহুল-প্রিয়াঙ্কাসহ বিরোধী নেতারা আটক

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুম: মংলায় যুবক নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত দাবি এইচআরডাব্লিউ-এর

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই ফিরবে, ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়: জাফর ইকবাল

নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতির গলাকাটা লাশ উদ্ধার

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় উত্থান: দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে ফিদেল কাস্ত্রোর পুরোনো সতর্কবার্তা

পাকিস্তানের জুলুম থেকে বাঁচতে বেলুচিস্তান অবশেষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে?

৬ মাসে ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার, আহত ২৩৪: এইচআরএসএস

দেশে-বিদেশে আস্থা হারাচ্ছে সরকার, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত: জি এম কাদের

১০

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ ঘণ্টার আন্দোলনে ঢাবিতে বিজিবি: সরকারের পদক্ষেপে বিতর্ক

১১

এএফপির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ছয় মাসেও থামেনি হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাড়ছে উদ্বেগ

১২

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় এর হুঁশিয়ারি: বাংলাদেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে

১৩

নাম বদল: ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান কি নতুন মোড় নিচ্ছে?

১৪

ভয়াবহ বন্যা: তারেক রহমান কি ফ্যামিলি নিয়ে মজা করতেই থাকবেন?

১৫

চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ৪৩ জনের মৃত্যু, ৯ লাখ মানুষ দিশেহারা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা

১৬

মনজুরুল হক-এর কলাম: রুচিহীনতা দেখিয়েছে ‘ডেইলিস্টার’, ‘প্রথমআলো’, ‘মানবজমিন’

১৭

হামে শিশু মৃত্যু ৭৫০ ছাড়িয়ে গেছে, নির্বিকার সরকার, টিকায় ভেজাল

১৮

বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে শেখ হাসিনার পরিকল্পনা: দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে ডিসেম্বরে ফিরে আত্মসমর্পণ

১৯

পাকিস্তানের ব্যর্থ ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থ লুটের প্রকল্প

২০