HMI
১৪ জুন ২০২৬, ৯:৫৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

জামায়াতের অর্থের খনি ফিরে পাওয়ার ষড়যন্ত্র: ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট

ডেস্ক রিপোর্ট:
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ জামায়াতের অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান উৎস এবং জাতীয় সংকটের এক উদাহরণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংক দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম। রেমিট্যান্স আহরণ, ক্ষুদ্রঋণ, আমদানি-রপ্তানি এবং শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর অবদান অপরিসীম। কিন্তু এই ব্যাংকের ইতিহাস শুধু আর্থিক সাফল্যের নয়—এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অনিয়ম এবং জাতীয় স্বার্থের গভীর সংঘাতেরও প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে এটি জামায়াতে ইসলামীর অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তির মূল উৎস হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে (২০২৬ সালের জুন মাসে) ব্যাংকটি ঘিরে যে তারল্য সংকট, রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং আস্থার সংকট চলছে, তা শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির গভীর বিভাজনের প্রতিফলন।

ঐতিহাসিক পটভূমি: জামায়াতের নিয়ন্ত্রণ থেকে এস আলমের যুগ
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসলামী ব্যাংক জামায়াতে ইসলামী ও তার আদর্শিক সহযোগীদের প্রভাবে পরিচালিত হয়েছে। এর মাধ্যমে জামায়াত তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা-মসজিদ এবং রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে অর্থায়ন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে শেখ হাসিনা সরকার এই নিয়ন্ত্রণ ভাঙার উদ্যোগ নেয়। যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রভাবমুক্ত করার অংশ হিসেবে ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয় এবং নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের হাতে। এস আলম গ্রুপের আমলে ব্যাংকটি ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়মের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। অর্ধেকেরও বেশি ঋণ চলে যায় গ্রুপসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি, কৌশলে শেয়ার হস্তান্তর এবং আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফলে ব্যাংকটি আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয় এবং নতুন পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৪-২৬: নিয়ন্ত্রণের নতুন দ্বন্দ্ব, নির্বাচনী অর্থায়নের অভিযোগ
২০২৪-এর পর জামায়াত-সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ফোরাম ও কর্মীদের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর ব্যাংকের বোর্ড ও চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। জামায়াত এটিকে অবৈধ হস্তক্ষেপ বলে দাবি করে এবং ‘প্রকৃত মালিকদের’ কাছে শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলে। সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে একটি দল (ইঙ্গিত জামায়াত বা ‘কোরআনের দল’-এর দিকে) ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস (একটি ফ্ল্যাগশিপ ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প) থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে ভোটের বৈতরণী পার হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারী গ্রাহকদের কাছে ১০ হাজার টাকা করে ঋণ দেওয়া হয় এবং ধর্মীয় প্রলোভন দেখিয়ে (‘জান্নাতের নিশ্চয়তা’) ভোট চাওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। মন্ত্রী আরও জানান, প্রকল্পে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে, যার মধ্যে নির্বাচনের আগে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং এর কোনো হদিস নেই। এছাড়া নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা এবং অন্য একটি গ্রুপকে অনিয়মিতভাবে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া, প্রায় ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা এবং রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ৬ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগের অভিযোগও উঠেছে।

বর্তমান সংকট: তারল্য চাপ, গ্রাহক উত্তোলন ও আস্থাহীনতা
এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। মাত্র কয়েক দিনে হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে বলে খবর। ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চেয়েছে। অনেক এটিএম বুথ বন্ধ হয়ে গেছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে টাকা উত্তোলন করে সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করে।

স্বাধীনতাপন্থীদের দৃষ্টিকোণ
স্বাধীনতার পক্ষের জনগণ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করেন, ইসলামী ব্যাংক জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত শক্তির হাতে এত বড় প্রতিষ্ঠান চলে যাওয়া জাতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অনেকে বলছেন—ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যাক বা পুনর্গঠিত হোক, কিন্তু জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে যেন না যায়। জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া জাতীয় স্বার্থ ও ১৯৭১-এর চেতনা বিরোধী।

সম্ভাব্য পরিণতি এবং করণীয়
এই সংকট অব্যাহত থাকলে ব্যাংক অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়বে পুরো ব্যাংকিং খাতে, বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক অন্যান্য ব্যাংকে। আমানতকারীদের আস্থা হারানো, রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সমাধানের পথ হলো স্বচ্ছ তদন্ত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ব্যবস্থাপনা, সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং প্রয়োজনে পুনর্গঠন বা মার্জার। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ব্যাংককে জনগণের স্বার্থে পরিচালনা করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের এই সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অর্থনীতি কখনো রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ১৯৭১-এর চেতনা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে পরাজিত অপশক্তির পুনরুত্থান ঘটবে। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সচেতন জনগণের সতর্কতা ও ঐক্য এখন অত্যন্ত জরুরি। শুধু ব্যাংক বাঁচানো নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ এটি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনূসের স্বেচ্ছাচারিতা ও তারেকের অবহেলায় হামে এ পর্যন্ত ৮০৩ শিশুর মৃত্যু 

দেশে ফেরার ঝুঁকি আমি জানি: জাপানের কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা

দিল্লিতে মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, রাহুল-প্রিয়াঙ্কাসহ বিরোধী নেতারা আটক

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুম: মংলায় যুবক নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত দাবি এইচআরডাব্লিউ-এর

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই ফিরবে, ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়: জাফর ইকবাল

নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতির গলাকাটা লাশ উদ্ধার

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় উত্থান: দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে ফিদেল কাস্ত্রোর পুরোনো সতর্কবার্তা

পাকিস্তানের জুলুম থেকে বাঁচতে বেলুচিস্তান অবশেষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে?

৬ মাসে ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার, আহত ২৩৪: এইচআরএসএস

দেশে-বিদেশে আস্থা হারাচ্ছে সরকার, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত: জি এম কাদের

১০

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ ঘণ্টার আন্দোলনে ঢাবিতে বিজিবি: সরকারের পদক্ষেপে বিতর্ক

১১

এএফপির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ছয় মাসেও থামেনি হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাড়ছে উদ্বেগ

১২

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় এর হুঁশিয়ারি: বাংলাদেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে

১৩

নাম বদল: ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান কি নতুন মোড় নিচ্ছে?

১৪

ভয়াবহ বন্যা: তারেক রহমান কি ফ্যামিলি নিয়ে মজা করতেই থাকবেন?

১৫

চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ৪৩ জনের মৃত্যু, ৯ লাখ মানুষ দিশেহারা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা

১৬

মনজুরুল হক-এর কলাম: রুচিহীনতা দেখিয়েছে ‘ডেইলিস্টার’, ‘প্রথমআলো’, ‘মানবজমিন’

১৭

হামে শিশু মৃত্যু ৭৫০ ছাড়িয়ে গেছে, নির্বিকার সরকার, টিকায় ভেজাল

১৮

বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে শেখ হাসিনার পরিকল্পনা: দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে ডিসেম্বরে ফিরে আত্মসমর্পণ

১৯

পাকিস্তানের ব্যর্থ ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থ লুটের প্রকল্প

২০