HMI
১৩ জুন ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

‘দুই শক্তি এক করার’ বার্তা: নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য ঘিরে আলোচনা

ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশে দায়িত্ব নিতে এসে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দেওয়া বক্তব্যকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের জনশক্তি, গণতান্ত্রিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, দুই দেশের সম্মিলিত শক্তি বিশ্বপর্যায়ে একটি বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। 

শুক্রবার বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষকে যুক্ত করলে ১৬০ কোটির একটি বিশাল জনসমষ্টি গড়ে ওঠে। এই বিপুল জনশক্তির কল্যাণ ও উন্নয়নই হওয়া উচিত দুই দেশের যৌথ লক্ষ্য। তার মতে, ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের স্বপ্ন, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। 

বাংলাদেশে প্রবেশের আগে কলকাতাতেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু সীমান্তভিত্তিক নয়, বরং দুই দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং উন্নয়নের স্বপ্নও অনেক ক্ষেত্রে অভিন্ন। সেই কারণেই তিনি দুই দেশের মানুষকে একটি বৃহত্তর জনসমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। 

বেনাপোলে তিনি আরও বলেন, তিনি দুই দেশকে আলাদা করে ভাবতে চান না; বরং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই ভবিষ্যৎ দেখেন। তার ভাষায়, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই ধরনের অনেক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে। তাই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।” ভিসাসংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

নতুন হাইকমিশনারের মতে, ভারত ও বাংলাদেশ—দুটি দেশই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই দুই গণতান্ত্রিক শক্তি যদি আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, তাহলে তা একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, একক শক্তি যথেষ্ট নয়; বরং দুই দেশের সম্মিলিত শক্তিই হবে প্রকৃত শক্তি, যা বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। 

তার এই বক্তব্যকে অনেকেই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের আহ্বান হিসেবে দেখলেও, কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এর পেছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সীমান্তে পুশইন ইস্যু, বিভিন্ন অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় সমস্যা এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অস্বস্তির প্রেক্ষাপটে ভারত একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও কৌশলী ব্যক্তিত্বকে ঢাকায় পাঠিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। 

একজন সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক অমীমাংসিত বিষয় এখনও বিদ্যমান। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে সীমান্তে অনুপ্রবেশ বা পুশইনের অভিযোগ। এ অবস্থায় দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত স্পষ্টতই সহযোগিতামূলক সম্পর্ক জোরদারের বার্তা দিতে চেয়েছে। তবে দুই দেশকে একীভূত করার প্রশ্ন বাস্তবসম্মত নয়, কারণ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। 

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহও দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যকে শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার বার্তা হিসেবে দেখলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষকে যুক্ত করার যে ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, সেটিকে আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশের জনগণ একটি স্বাধীন জাতি, যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে কোনো ধরনের একীভূত হওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং পারস্পরিক মর্যাদা, সহযোগিতা এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়াই হওয়া উচিত দুই দেশের লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহী। ভারত যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে পুরো দক্ষিণ এশিয়াই বিশ্বপরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যকে কেউ দেখছেন দুই দেশের জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও সহযোগিতার বার্তা হিসেবে, আবার কেউ এর মধ্যে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত খুঁজছেন। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমতার নীতি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনূসের স্বেচ্ছাচারিতা ও তারেকের অবহেলায় হামে এ পর্যন্ত ৮০৩ শিশুর মৃত্যু 

দেশে ফেরার ঝুঁকি আমি জানি: জাপানের কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা

দিল্লিতে মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, রাহুল-প্রিয়াঙ্কাসহ বিরোধী নেতারা আটক

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুম: মংলায় যুবক নিখোঁজের ঘটনায় তদন্ত দাবি এইচআরডাব্লিউ-এর

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই ফিরবে, ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়: জাফর ইকবাল

নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতির গলাকাটা লাশ উদ্ধার

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় উত্থান: দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে ফিদেল কাস্ত্রোর পুরোনো সতর্কবার্তা

পাকিস্তানের জুলুম থেকে বাঁচতে বেলুচিস্তান অবশেষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে?

৬ মাসে ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার, আহত ২৩৪: এইচআরএসএস

দেশে-বিদেশে আস্থা হারাচ্ছে সরকার, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত: জি এম কাদের

১০

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ ঘণ্টার আন্দোলনে ঢাবিতে বিজিবি: সরকারের পদক্ষেপে বিতর্ক

১১

এএফপির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ছয় মাসেও থামেনি হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাড়ছে উদ্বেগ

১২

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় এর হুঁশিয়ারি: বাংলাদেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে

১৩

নাম বদল: ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান কি নতুন মোড় নিচ্ছে?

১৪

ভয়াবহ বন্যা: তারেক রহমান কি ফ্যামিলি নিয়ে মজা করতেই থাকবেন?

১৫

চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ৪৩ জনের মৃত্যু, ৯ লাখ মানুষ দিশেহারা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা

১৬

মনজুরুল হক-এর কলাম: রুচিহীনতা দেখিয়েছে ‘ডেইলিস্টার’, ‘প্রথমআলো’, ‘মানবজমিন’

১৭

হামে শিশু মৃত্যু ৭৫০ ছাড়িয়ে গেছে, নির্বিকার সরকার, টিকায় ভেজাল

১৮

বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে শেখ হাসিনার পরিকল্পনা: দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে ডিসেম্বরে ফিরে আত্মসমর্পণ

১৯

পাকিস্তানের ব্যর্থ ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থ লুটের প্রকল্প

২০