ডেস্ক রিপোর্ট:
পদ্মা সেতু শুধু দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই নয়, এবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রেও নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই অবকাঠামো এখন নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়া-২-এ স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে গত মে মাসে জাতীয় গ্রিডে ৫৪ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বা ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
বুধবার বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা শিকদার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, পদ্মা সেতুর আওতাধীন সার্ভিস এরিয়া-২-এ ২ দশমিক ৪৯ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও চালু করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। এ ব্যবস্থায় দিনের বেলায় সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে সার্ভিস এরিয়া-২-এর নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। এরপর অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। আবার রাতের সময় কিংবা মেঘলা আবহাওয়ায় যখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, তখন প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়।
গত মে মাসে পদ্মা সেতুর এই সৌর প্রকল্প থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ৫৪ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি থেকে গ্রিডের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৪ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ। ফলে হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ প্রায় ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছে।
এই সাশ্রয়ের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রেও। ২০২৬ সালের জুন মাসে সার্ভিস এরিয়া-২-এর জন্য কোনো বিদ্যুৎ বিল আসেনি। কেবল ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৭৫ হাজার ৭১৪ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। অথচ এর আগের মাস মে-তে একই স্থাপনার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৫ লাখ ২১ হাজার ৬৪ টাকা। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।
সেতু বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ এই উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফল প্রয়োগ দেশের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এটি একদিকে যেমন বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতে সহায়তা করছে, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির নীতি বাস্তবায়নে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর অবদান রাখবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়া-১, ২ ও ৩-এ পর্যায়ক্রমে মোট ৬ দশমিক ০৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্ভিস এরিয়া-২-এর প্রকল্প ইতোমধ্যে চালু হয়েছে এবং সার্ভিস এরিয়া-১ ও ৩-এ নেট মিটারিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের বৃহৎ অবকাঠামোগুলোতে এ ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সম্প্রসারণ ঘটলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হবে। পদ্মা সেতুর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
মন্তব্য করুন