ডেস্ক রিপোর্ট:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগের পর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। ভারতের সংবাদমাধ্যম News18-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেছেন, শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণেই তিনি রাজনৈতিকভাবে টার্গেটের শিকার হয়েছেন এবং তার মায়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাকে ‘বলির পাঁঠা’ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
WHO-এর নেতৃত্ব, বিশেষ করে সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তার দাবি, সংস্থাটির অভ্যন্তরে সবার জন্য একই ধরনের নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, WHO-তে ‘দুই সেট নিয়ম’ কার্যকর রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হলেও টেড্রোসকে তদন্ত, ছুটি কিংবা বেতনহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি; অথচ তাকে দীর্ঘ সময় ছুটিতে থাকতে হয়েছে এবং প্রায় এক বছর বেতন ছাড়াই থাকতে হয়েছে।
সায়মা ওয়াজেদের বক্তব্য অনুযায়ী, WHO-এর বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে নেতিবাচক হয়েছে। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে WHO-কে তিনি সবসময় অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে দেখেছেন এবং নিজের পেশাগত জীবনের বড় একটি সময় সংস্থাটির কাজে ব্যবহার করেছেন। তবে বর্তমান মহাপরিচালকের নেতৃত্ব নিয়ে তার আস্থা নষ্ট হয়েছে।
News18-এর প্রশ্নের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, তিনি WHO-এর যথাযথ তদন্তপ্রক্রিয়া ও কর্মীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্বের আচরণকে তিনি ‘জবরদস্তিমূলক’ বলে বর্ণনা করেন এবং অভিযোগ করেন, টেড্রোস তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন। গত প্রায় দেড় বছর ধরে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের পর সেগুলোর জবাব দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সময় তিনি প্রতিশোধমূলক আচরণ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন।
WHO-এর তদন্তে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়েও কথা বলেন সায়মা। চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে সফর নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত হয়ইনি, কারণ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, ওই বিষয়ে আর্থিক জালিয়াতির মিথ্যা অভিযোগ থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।
বাংলাদেশে ২০২১ সালে জমি কেনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন সায়মা ওয়াজেদ। তার দাবি, WHO-কে চারটি পৃথক আইনি মতামত দেওয়া হয়েছিল, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো আইনগত ও প্রক্রিয়াগতভাবে অবৈধ এবং এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তপ্রক্রিয়া শেষ হয়ে থেমে যাওয়ার পরই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তদন্তে তিনি সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান। দীর্ঘ সময় ধরে ছুটিতে থাকা এবং বেতন না পাওয়ার কারণে তিনি মানসিক ও আর্থিকভাবে চরমভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন।
সায়মা বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি ছুটিতে ছিলেন এবং প্রায় এক বছর বেতন পাননি। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তিনি কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন এবং নিজের বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিলেন বলে দাবি করেন। এ অবস্থায় তাঁর মূল কাজে ফিরে যাওয়া এবং মানুষের জন্য কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে বলেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার পর তাঁর সামনে পদত্যাগ করে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপ ও আর্থিক ক্ষতির পর তিনি আবার কাজে ফিরতে চান এবং বিশ্বের জন্য ভালো কিছু করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে চান।
সাক্ষাৎকারে News18-এর পক্ষ থেকে WHO-এর অভ্যন্তরীণ নথির প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদের আইনি দল WHO মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের পরিস্থিতির সঙ্গে তার পরিস্থিতির তুলনা করেছিল। অভিযোগ ছিল, টেড্রোসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ধরনের অভিযোগ ওঠার পর তার বিরুদ্ধে WHO-এর পক্ষ থেকে একই ধরনের তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি বলেন, WHO-তে ‘দুই সেট নিয়ম’ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইথিওপিয়া-সংক্রান্ত একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সময় টেড্রোসকে ছুটিতে যেতে হয়নি এবং তাকে বেতন ছাড়া রাখা হয়নি।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে টেড্রোসের কথিত যোগাযোগের বিষয়টিও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। News18 জানতে চায়, সায়মা ওয়াজেদের আইনি নোটিশে যেভাবে বিষয়টি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাতে WHO মহাপরিচালক টেড্রোস এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে কোনো ধরনের যোগসাজশ ছিল কি না।
এর জবাবে সায়মা ‘যোগসাজশ’ শব্দটিকে শক্তিশালী শব্দ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কিছু প্রমাণ রয়েছে। তার দাবি, টেড্রোস তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং সেই যোগাযোগ স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়নি।
তিনি টেড্রোসের সঙ্গে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগের বিষয়ে প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন এবং ওই যোগাযোগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ আসে যখন তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়—শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণেই কি তিনি টার্গেটের শিকার হয়েছেন?
জবাবে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, তিনি শেখ হাসিনার মেয়ে এবং এ কারণেই তাকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর মায়ের রাজনৈতিক শত্রুরা তাকে ‘স্কেপগোট’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের ঘিরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে WHO-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকেও রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিহিংসার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন সায়মা ওয়াজেদ।
সায়মা ওয়াজেদের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি WHO-এর প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমালোচনা না করে বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জনস্বাস্থ্য বিষয়ক ভূমিকার প্রতি তার আস্থা ও শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু সংস্থাটির বর্তমান মহাপরিচালকের আচরণ এবং তার বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্তপ্রক্রিয়া তার সেই আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
পদত্যাগের পর দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে সায়মা ওয়াজেদ মূলত তিনটি বিষয় সামনে এনেছেন—WHO-এর তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর আপত্তি, টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ এবং শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণে রাজনৈতিক টার্গেটের শিকার হওয়ার দাবি।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, WHO-এর সঙ্গে দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক লড়াই তাকে ব্যক্তিগতভাবেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘ সময় কর্মস্থলের বাইরে থাকা, বেতন না পাওয়া এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত তদন্তপ্রক্রিয়া সম্পন্ন ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পদত্যাগকে নিজের জন্য একটি নতুন শুরুর সুযোগ হিসেবে দেখছেন সায়মা ওয়াজেদ। তিনি আবার কর্মজীবনে ফিরতে চান এবং জনস্বাস্থ্য ও মানুষের কল্যাণে কাজ চালিয়ে যেতে চান বলে জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন