ডেস্ক রিপোর্ট:
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, ইউনূসের সময়কার রাজনৈতিক ধারা থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাঁর দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও ‘প্রতিশোধ, বর্জন ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের’ রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Sunday Guardian-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য দেন। সাক্ষাৎকারটি ৩০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত হয়। (Sunday Guardian Live)
বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের ‘মুখ বদলেছে’, কিন্তু রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বদলায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, বিরোধীদের বর্জন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা শুরু হয়েছিল, তারেক রহমানের সরকারও সেই পথেই এগোচ্ছে।
শেখ হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল আগের সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, তাঁর গঠিত জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর সহিংসতা ও মৃত্যুর তদন্তে বিচারিক তদন্ত কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর আরও অভিযোগ, আইন পরিবর্তন, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক শাস্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কারাগারে রাখা এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা—এসব প্রবণতা এখনও অব্যাহত।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী কারাগারে, অনেকে আত্মগোপনে এবং অনেকে নিজেদের বাড়িঘর, চাকরি ও ব্যবসা হারিয়েছেন।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি, সংখ্যালঘু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে এবং উগ্রবাদী তৎপরতা অনেক বেড়েছে।
বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা করেছেন শেখ হাসিনা।
সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬.৮০ শতাংশ ছিল, তা বর্তমানে ২.২২ শতাংশে নেমে এসেছে। তাঁর দাবি, শিল্প উৎপাদন কমেছে এবং ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, দারিদ্র্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়েও তিনি বেশ কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী—
শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসার ইচ্ছা আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেন, রাজনীতি তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং দায়িত্ব।
তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের সেবা করা।
তিনি জানান, যতটা সম্ভব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, কারাগারে থাকা, আত্মগোপনে থাকা কিংবা নানা ধরনের চাপের মধ্যেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সংগঠিত রয়েছেন।
শেখ হাসিনার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার সুযোগ তাঁর নেই। কারণ বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আবার গণতন্ত্র, নিরাপত্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা, উন্নয়ন ও মর্যাদার পথে ফিরিয়ে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
সাক্ষাৎকারে নিজের ১৫ বছরের শাসনামলের একটি উন্নয়নচিত্রও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে অগ্রসর হয়েছে। দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
তিনি আরও বলেন, মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে ২,৭৮৪ ডলারে উন্নীত হয় এবং দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ১৮.৭ শতাংশে নেমে আসে। চরম দারিদ্র্য ২৫.১ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে নেমেছিল।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩,৭৮২ মেগাওয়াট থেকে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে এবং দেশের সব নাগরিক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
নিজের সরকারের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর তালিকায় তিনি উল্লেখ করেন—
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, সড়ক-মহাসড়ক, সেতু, বন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল।
এর পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি সহায়তা, ডিজিটাল সেবা এবং ভূমিহীনদের জন্য ঘর নির্মাণের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শেখ হাসিনার বলেন—বর্তমান সময়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যত প্রচারণাই হোক, মানুষ প্রতিদিন যে সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, বন্দর ও ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করছে, সেগুলো অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
তাঁর মতে, সাময়িক রাজনৈতিক মিথ্যা প্রচারণা ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদি বিচারের সামনে টিকবে না।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে আওয়ামী লীগকে কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে—এ প্রশ্নেও বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা বলেছেন শেখ হাসিনা।
তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের প্রথম কাজ হবে রাজনৈতিক নবায়ন। প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে ভোটাধিকার, নিরাপত্তা, জীবিকা এবং মানুষের মধ্যে নতুন আশার বার্তা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তিনি দলের নেতাকর্মী ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তৃতীয়ত, তিনি রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দলিল সংরক্ষণের কথা বলেন। তাঁর মতে, হত্যাকাণ্ড, গুম, মিথ্যা মামলা, হেফাজতে মৃত্যু, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং নারী, শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতার প্রতিটি ঘটনা নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, তিনি তৃণমূল থেকে দল পুনর্গঠনের কথা বলেন।
শেখ হাসিনার মতে, আওয়ামী লীগের শক্তি সবসময় এসেছে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, শ্রমিক, কৃষক, নারী, ছাত্র, যুবক ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে। তাই ‘ড্রয়িংরুম’ থেকে নয়, তৃণমূল থেকে সংগঠন পুনর্গঠন করতে হবে।
তিনি তরুণ নেতৃত্ব, নারী, পেশাজীবী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং তৃণমূলের সংগঠকদের সামনে আনার কথাও বলেন।
তবে এই পুনর্গঠনের মধ্যেও দলের মূল আদর্শ—মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব—অক্ষুণ্ণ থাকবে বলে জানান তিনি।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি ছিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক।
শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাঁর মতে, এই সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ইতিহাস, ভূগোল, মুক্তিযুদ্ধ, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নদী, যোগাযোগ, সংস্কৃতি এবং ১৯৭১ সালের রক্তের বন্ধনের ওপর।
তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য:
ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের প্রতি বাংলাদেশের কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি বাংলাদেশের নিজের জাতীয় স্বার্থের অংশ।
শেখ হাসিনা ভারতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশের সীমান্ত, নদী, নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তাঁর মতে, দায়িত্বশীল নেতৃত্বকে স্লোগানের পরিবর্তে পরিণত ও বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।
শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, তাঁর সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আস্থার একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হয়েছিল।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন—
একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও তাঁর সরকার চীন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি মানে কোনো দেশের সঙ্গে শত্রুতা নয়; বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা।
তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিষ্ঠিত নীতিকে সামনে এনে বলেন—সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।
শেখ হাসিনা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশকে যেন বিদেশি শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার ‘খেলার মাঠে’ পরিণত হতে না দেওয়া হয়।
তাঁর মতে, উগ্রবাদী তৎপরতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বক্তব্য হলো, দুই দেশের সম্পর্ক শক্তিশালী রাখতে হলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ, স্বচ্ছ পররাষ্ট্রনীতি এবং দায়িত্বশীল আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশই ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো প্রতিবেশী হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল—ভয় পাওয়া যাবে না এবং হতাশ হওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে আত্মত্যাগ, সাহস, ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ এবং ন্যায়বিচারের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। তাঁর দাবি, বর্তমানে সেই আদর্শ চ্যালেঞ্জের মুখে।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং সংখ্যালঘু, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পেশাজীবীদের ওপর চাপ রয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ অতীতেও ভয়কে পরাজিত করেছে—পাকিস্তানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই তার উদাহরণ।
তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, বর্তমান ‘অন্ধকার অধ্যায়’ও শেষ হবে।
মন্তব্য করুন