ডেস্ক রিপোর্ট:
থানা-পুলিশ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, স্থানীয় সংসদ সদস্য আর রাজনীতিবিদ–সবার কাছেই গত দুই বছরে গেছেন ২০২৪ সালের অগাস্টে গাজী টায়ারসে অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা। কিন্তু পেয়েছেন কেবল আশ্বাস। নিখোঁজদের সন্ধান কিংবা ঘটনার কোনো প্রতিকার তারা পাননি।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, নিখোঁজের তালিকায় থাকা ১৮২ জনের মধ্যে কারও সন্ধান তারা পাননি। তাদের ধারণা, আগুনে পুড়েই তারা মারা গেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারি কোনো ঘোষণা না থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা পড়েছেন আরও বিপাকে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মৃত্যুসনদ কিংবা ওয়ারিশ সনদের মত সরকারি কাগজপত্র তৈরিতে জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে পরিবারগুলো। এমনকি তাদের শিশু সন্তানদের জন্মসনদও তৈরি করা যাচ্ছে না। এসব কাগজপত্র তৈরি করতে কেউ কেউ তথ্য গোপনের মত প্রক্রিয়ায় যাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন।
আগুনের ঘটনায় উপজেলার মৈকুলী এলাকার ইলেকট্রিক মিস্ত্রি শাহাদাত শিকদার (৩০), তার ভাই সাব্বির শিকদার (২৬) ও বোনের স্বামী জমির আলী (৩৬) নিখোঁজ হন। নিখোঁজের তিন মাস পর জন্ম হয় শাহাদাতের সন্তান আব্দুল্লাহর। কিন্তু গত ১৭ মাসেও শিশুটির জন্ম সনদ করাতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা।
শাহাদাতের বোন সিনথিয়া আক্তার বলেন, “এত দিনেও যখন তারা কেউ ফেরেনি, আমরা বুঝতে পারতেছি যে, তারা আর বেঁচে নেই। কিন্তু মৃত্যুসনদ না থাকায় জন্ম নিবন্ধন বা ওয়ারিশ সনদ কিছুই করাতে পারতেছি না। ভাইয়ের নামে কিস্তির টাকা ছিল, মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় তাও মাফ হইতেছে না। রোজ এ নিয়ে কিস্তির লোকজন আইসা কথা শোনায়।”
গত দুই বছরে পরিবারের তিন সদস্যের সন্ধান পেতে নানাজনের কাছে গেছেন সিনথিয়া। তিনি বলেন, “আমাগো কোনো রাগ-ক্ষোভ নাই। আমরা গরিব মানুষ, আমরা রাগ করলেই বা কী আর করলেই বা কী!”
কথাগুলো বলার সময় দুচোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছিল সিনথিয়ার।
উপার্জনক্ষম দুই ভাই ও বোনের স্বামীকে হারিয়ে আর্থিকভাবে খুব দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এ তরুণী। জানালেন, পরিবারের হাল ধরতে স্থানীয় একটি সাবান কারখানায় চাকরি নিয়েছেন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন নিখোঁজ মো. আরিফের স্ত্রী ফারজানা। ২৭ বছর বয়সী আরিফ একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করতেন।
ফারজানা বলেন, “আগে ভাড়াবাসায় থাকতাম। অনেক ভাড়া জইমা যাওয়ায় মায়ের বাড়িতে চলে আসছি। ছেলেটারে কেজি স্কুলে পড়াইতাম, ওইটাই ছাড়ান দিছি। এখন সরকারি স্কুলে যায়। আরেক বাচ্চা আরো ছোট। ওরে রাইখা কাজেও যাইতে পারি না।
“দিন যাইতাছে সবার ঠিকমতই, কিন্তু আমাদের জীবনডা তো থাইমা আছে।”
ছেলের সন্ধান পেতে এখনো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও থানা পুলিশের কাছে ধরনা দিচ্ছেন ব্যাটারি কারখানার শ্রমিক আমান উল্লাহর বৃদ্ধা মা রাশিদা বেগম। কয়েকদিন পরপর গাজী টায়ারস কারখানার সামনেও যান, যদি কোনো খোঁজ পান ছেলের, এই আশায়। কিন্তু গত দুই বছরে কেউই তার ছেলের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি।
কাঁদতে কাঁদতে রাশিদা বলেন, “আমারে যদি পোলাডার হাড়গোড়ও দিতো। বুকে চাইপা ধইরা দুঃখ ভুইল্লা যাইতাম। আমার বাপধনের পোড়া ছাইটাও তো পাইলাম না।”
দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে দুই কক্ষের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন ট্রাকচালক নূর হোসেন ও তার স্ত্রী পারভীন বেগম। গাজী টায়ারসের কারখানায় নূর নিখোঁজ হওয়ার পর ওই বাসা ছেড়ে টিনশেডের এক কক্ষের একটি বাসায় উঠতে হয়েছে পারভীনকে।
দুই বছরেও সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা না আসায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মানুষটা তো ফিরে নাই। উনি যে মারা গেছেন এই ঘোষণা দিলেও তো বিধবা ভাতার একটা কার্ড করাইতে পারি। তাও তো করতেছে না।”
কী ঘটেছিল সেদিন
রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসী এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গাজী টায়ারস কারখানার মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দফায় এ কারখানায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
জেলা প্রশাসনের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ অগাস্ট প্রথমবার এই কারখানায় লুটপাট চালানো হয়। ওই সময় কারখানাটির বেশকিছু স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। তখন লুটপাট চলে ৮ অগাস্ট পর্যন্ত। তারপর থেকে কারখানার ওই ভবনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল।
পরে ২৫ অগাস্ট ভোরে গ্রেপ্তার হন গোলাম দস্তগীর গাজী। ওইদিন রাতে রূপগঞ্জের টায়ার প্রস্তুতকারী কারখানাটিতে দ্বিতীয় দফায় লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পরদিন সকাল থেকেই আশপাশের এলাকার বহু মানুষ কারখানার ফটকে জড়ো হন। তাদের ভাষ্য ছিল, লুটপাট, অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় গিয়ে আর ফেরেননি তাদের পরিবারের কোনো সদস্য।
প্রশাসন তাদের কাছ থেকে নিখোঁজদের ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র রেখে নাম নিবন্ধন শুরু করে। ১৮২ জন নিখোঁজের তালিকা করা হয়।
সেবার ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের টানা ২২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন পুরোপুরি নেভে পাঁচ দিন পর। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে ভবনটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হওয়ায় সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো যায়নি।
আগুন নেভানোর পর ভবনটির বেজমেন্টে প্রাথমিক একটি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু সেখানে হতাহত কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে আর কোনো উদ্ধার অভিযান এ ভবনটিতে চালানো হয়নি।
সরকারি তদন্ত
ওই বছরের ২৭ অগাস্ট তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করেন কমিটির প্রধান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি ৫ অগাস্টের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করত, তাহলে প্রায় তিন সপ্তাহ পরে ভয়াবহ আগুন লাগা এড়ানো সম্ভব হত।
তদন্ত কমিটি বলেছে, ছয় তলা কারখানা ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় তামা ও রাসায়নিক লুট করতে গিয়ে একদল অনুপ্রবেশকারী নিচতলার গেট বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে চলে যায়। ভবনে দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
আগুনের ঘটনার পাঁচ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর কারখানাটির সামনে গণশুনানির আয়োজন করে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি।
ওই সময় নিখোঁজ ৮০টি পরিবারের সদস্যরা তাতে অংশ নেন। গণশুনানি শেষে নিখোঁজ স্বজনরা বাধা উপেক্ষা করে ভবনে ঢোকেন এবং ভবনটি থেকে ১৫ খণ্ড হাড় উদ্ধার করেন। পরে তা পুলিশের কাছে জমা রাখা হয়।
হাড়গুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য তখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের কাছে পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী গত শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনের তালিকা ধরে আমরা নিখোঁজদের খোঁজ করেছিলাম। কিন্তু কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। আমরা ধারণা করছি, তারা মারা গেছেন।”
ভবন থেকে উদ্ধার হওয়া হাড়গুলো এখনো সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে রয়েছে জানিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ডিএনএ পরীক্ষা করলে হয়ত ওই হাড়গুলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের কিনা নিশ্চিত হওয়া যেত। কিন্তু এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা না থাকায় পরবর্তী কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি।”
কয়েকদিন আগেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা কার্যালয়ে এসে দেখা করেছিলেন জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, “কয়েকটি পরিবারের লোকজন আমার কাছে এসেছিলেন, কিন্তু এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। আমরা এ বিষয়ে খোঁজখবর করে একটা আপডেট দিতে পারব।”
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি কাগজপত্র তৈরিতে কোনো জটিলতা হলে তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
এ ঘটনায় গাজী টায়ারস কর্তৃপক্ষ ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে থানায় দুটি মামলা করলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে সেখানে কিছু বলা নেই।
জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (রপগঞ্জ-আড়াইহাজার সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, “লুটপাটের অভিযোগে কারখানা কর্তৃপক্ষ দুটি মামলা করেছে। ওই মামলা দুটির তদন্ত করছে পুলিশ। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কিছু নেই।”
জানতে চাইলে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ওই সময় চাইলে পুলিশ বাদী হয়ে নিখোঁজদের বিষয়ে মামলা করতে পারত। কিন্তু কেন করেনি তা তখনকার দায়িত্বশীলরা বলতে পারবেন। তবে আমরা নিখোঁজ ১৮২ জনের তালিকা ধরে তাদের সন্ধান করেছিলাম। কাউকে আমরা পাইনি।
“এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।”
এদিকে নিখোঁজ তিনটি পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা তখন মামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় ‘লুটপাট করতে গিয়ে মারা গেছে’, ‘মামলা করলে আরও ঝামেলায় পড়বেন’- এই ধরনের ভয় থেকে আর মামলার দিকে যাননি।
তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কয়েকজন তাদের পরিবারের সদস্যদের নিখোঁজ থাকার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলে জানান। (সূত্র: বিডিনিউজ)
মন্তব্য করুন