ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশ ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান এখন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। একসময় যিনি দেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন, সেই সাকিব আজ দেশছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে চরম হয়রানি, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার ও মব হামলার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন বাংলাদেশের এই সাবেক অধিনায়ক।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসান তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দেশে ফিরতে না পারা এবং তাকে ঘিরে চলমান বিতর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সেই সাক্ষাৎকারের বিভিন্ন অংশ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, সাকিব নিজেকে একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবেই দেখছেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক ব্যক্তি ও সাবেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়ায় সাকিবও সেই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়। তবে সাকিবের দাবি, যে ঘটনার মামলায় তার নাম জড়ানো হয়েছে, তার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় ও জনপ্রিয়তার কারণেই তাকে টার্গেট করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল মামলা থেকে নাম সরিয়ে দেওয়ার নামে এক কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ। সাকিব বলেন, তার কাছে এমন প্রস্তাব এসেছিল যে টাকা দিলে মামলার এজাহার থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হবে। তবে তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হননি। তার ভাষায়, টাকা দেওয়া মানে নিজের অপরাধ স্বীকার করা। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যারা এমন প্রস্তাব দিয়েছে, তারা আইনগত বাস্তবতা বোঝে না। কারণ মামলায় নাম উঠে গেলে শেষ পর্যন্ত তদন্ত সংস্থার ক্লিয়ারেন্স ছাড়া বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ নেই।
সাকিব আরও ইঙ্গিত দেন, এ যোগাযোগ এসেছে বাদীপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে। যদিও তিনি সরাসরি কারও নাম প্রকাশ করেননি। কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত মামলা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
দেশে ফেরা প্রসঙ্গে সাকিবের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ফিরে আসা তার জন্য নিরাপদ নয়। কারণ দেশে ফিরলে শুধু আইনি জটিলতাই নয়, শত্রুতামূলকভাবে হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজের বিদায়ী টেস্ট খেলতে দেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা-ঝুঁকির কারণে মাঝপথ থেকেই তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যেও তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একদিকে তাকে জাতীয় দলে ফেরানোর আলোচনা, অন্যদিকে সরকারের ভেতর থেকে আপত্তি—এই দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন সময়। এমনকি তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে, সাকিবকে আর বাংলাদেশের পতাকা বহন করতে দেওয়া উচিত নয়। পরে অবশ্য বিসিবির ভেতরে নতুন করে তাকে দলে ফেরানোর আলোচনা শুরু হয়।
সাকিবের পুরো পরিস্থিতি এখন কেবল ক্রিকেটীয় ইস্যু নয়; বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ, যিনি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তিনি এখন নিজের দেশে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন—এই বাস্তবতা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার দিকটিও সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের সহিংস রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর যেভাবে বিভিন্ন সেক্টরের পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাতে সাকিবও সেই ঢেউয়ের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে তার সংসদ সদস্য পরিচয় তাকে আরও বেশি রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে ঠেলে দেয়। অথচ ক্রিকেটীয় পরিচয়ে তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা সাকিব আল হাসান আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলছেন। তবে তার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলা। কিন্তু মামলা, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই স্বপ্ন এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।
মন্তব্য করুন