যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে প্রকাশিত অডিও রেকর্ডের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এতে মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতে ইসলামীকে “বন্ধু” হিসেবে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন বলে শোনা গেছে। ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন ডিপ্লোম্যাট গত ১ ডিসেম্বর নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেছেন, “দেশটি এখন ইসলামীভাবে সরে গেছে” এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী “আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় ভালো ফল করবে।” সে বৈঠকের অডিও রেকর্ডে তিনি বলেন, “আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির কখনোই সাধারণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপক্ষীয় অবস্থান, পরবর্তী কালে সহিংস রাজনীতি ও সংখ্যালঘু-বিরোধী কার্যকলাপ—এই সবের কারণে জামায়াত এবং শিবিরের ইমেজ মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী-ঝুঁকিপূর্ণ শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কাছে দীর্ঘদিন অগ্রহণযোগ্য ছিল।
তবে ওয়াশিংটন পোস্টের সেই ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড প্রকাশ করে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মহল পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ তারা মনে করছে, আগামী নির্বাচনেই জামায়াত “অতীতের সর্বোচ্চ ফল” অর্জন করতে পারে এবং রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিবর্তনের পেছনে একটি কূটনৈতিক বিশ্লেষণ রয়েছে—যা আদর্শের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ক্ষমতার হিসাবজাত লজিকের আলোকে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সর্বদাই তার প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপে প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক জায়গায় নির্বাচনের ফলাফল ও ক্ষমতার ভাগাভাগিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন যদি আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে ওয়াশিংটনের কৌশলও সেই দিকেই সরে আসে।
অডিও রেকর্ডে মার্কিন কূটনীতিক জামায়াতের জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হয়ে “বন্ধু হতে চাই” মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি এমন ইঙ্গিতও দেন যে, শুধুমাত্র ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলো নয়, জামায়াতের “প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের” সদস্যদেরও সেই সুযোগ দেয়া অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
এই অবস্থানটি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য শুধু আশঙ্কার নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্যও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার, এবং স্বাধীনতা-বিরোধী গঠন একটি বিরাট বাধা হিসাবে কাজ করেছে। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে জামায়াত কখনোই একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়নি— তাতে নির্বাচনে যত আসনই পাক।
তবে সংশ্লিষ্ট অডিও রেকর্ডে মার্কিন কূটনীতিক যেমন জামায়াতকে বন্ধু হিসেবে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তেমনই তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, জামায়াত যদি শাসনক্ষমতায় আসে এবং ধর্মীয় আইন চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তা প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে এবং অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্রস্তুত আছে—যেমন ব্যবসায়িক শুল্ক আরোপ করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারী পররাষ্ট্রনীতির একটি নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে—যেখানে নিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র বা মানবাধিকার নয়, ক্ষমতার সম্ভাবনা ও স্বার্থের হিসাব কর্তৃত্বে উঠে এসেছে।
যতই জামায়াত নতুন করে রাজনৈতিক মঞ্চে শক্তি সঞ্চয় করুক, এর মৌলবাদী অতীত ও সংখ্যালঘু-বিরোধী ইতিহাস বাংলাদেশির হৃদয়ে কখনো ভুলানো যাবে না। তারা নির্বাচনী কারচুপিতে কিছু আসন পেতে পারে, কৌশলে ক্ষমতায় অংশ নিতে পারে, কিন্তু দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মন জয় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব—এটাই ইতিহাস ও বাস্তবতার কঠিন সত্য।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতার নেশা ও বিদেশি স্বার্থের সাথে মিলিত হয়ে এমন কৌশলগত শিফট হতে পারে। কিন্তু জনমতের বাস্তবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। কেননা মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানুষের অধিকার বাংলাদেশের জনগণের জন্য চিরস্থায়ী মূল্যবোধ।
Facebook Comments Box
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
অবৈধ ইউনূস প্রশাসন থেকে দেশ উদ্ধারে শেখ হাসিনার ৫ দফা
১
সন্ত্রাসের অতীত ভুলে ক্ষমতার হিসাব: জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা!
২
রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছে ইউনূস: আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা