Hussain Muhammad Imam
২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৮:৩৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বকাপের দরজা বন্ধ, অন্ধকারে যাত্রা বাংলাদেশের ক্রিকেটের

বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে বাংলাদেশের ছিটকে পড়া কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি ছিল ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের অনিবার্য পরিণতি। মাঠের পারফরম্যান্স নয়, খেলোয়াড়দের অযোগ্যতা নয়, এমনকি প্রতিপক্ষের শক্তিও নয়—বাংলাদেশ আজ বিশ্বকাপের বাইরে শুধুমাত্র নিজের ভুল সিদ্ধান্ত, বিকৃত নীতিবোধ এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন উপদেষ্টাদের চিন্তার কারণে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রবেশ করল এক গভীর অনিশ্চয়তার অন্ধকার সুড়ঙ্গে, যেখানে সামনে আলো নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়ের আশঙ্কাই প্রবল।
আইসিসির নির্ধারিত বিশ্বকাপ কাঠামো ও আয়োজক দেশের বিষয়ে আপত্তি তুলে বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে, সেটি ছিল ক্রীড়াগত বাস্তবতা বিবর্জিত এক রাজনৈতিক ও আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেখানে প্রতিটি দল কূটনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও আইসিসির প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত মেনে এগোয়, সেখানে বাংলাদেশ নিজের জন্য ব্যতিক্রমী আচরণ বেছে নিয়েছে। এই অবস্থানের নেপথ্যে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তিনি হলেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল—যাঁর বক্তব্য ও পরামর্শ বারবার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে ঠেলে দেওয়া বলে সমালোচিত হয়েছে।
ভারতে খেলা মানেই নিরাপত্তাহীনতা—এই সরলীকৃত ও একমাত্রিক যুক্তিকে সামনে এনে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। অথচ একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দল, এমনকি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর দলও সেখানে খেলতে প্রস্তুত ছিল। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন, আইসিসির নিজস্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা আগের অভিজ্ঞতার কোনো দিকই এই আপত্তিকে সমর্থন করেনি। বরং এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সিদ্ধান্তটি ছিল তথ্যভিত্তিক নয়, বরং ব্যক্তিগত ধারণা ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ফসল।
এই সিদ্ধান্তের ফলাফল ছিল ভয়াবহ। আইসিসির ভোটাভুটিতে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান আদায় করতে ব্যর্থ হয়। বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী সংস্থার সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিজেই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর পথে হাঁটে। এর মাধ্যমে শুধু একটি টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়া নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট নিজেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন করে ফেলল আন্তর্জাতিক ধারাবাহিকতা থেকে। বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই যেখানে অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক আয়, ব্র্যান্ড ভ্যালু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুপ্রেরণা—সেই সবকিছুর দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে খেলোয়াড়দের ওপর। যারা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে, ইনজুরি নিয়ে মাঠে নামে, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রমাণের স্বপ্ন দেখে—তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া হলো কোনো ক্রিকেটীয় ব্যর্থতা ছাড়াই। তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এটি এক ভয়ংকর বার্তা: পরিশ্রম নয়, পারফরম্যান্স নয়—সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে কিছু মানুষের খেয়ালখুশি ও রাজনৈতিক অবস্থান।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। একটি স্বায়ত্তশাসিত ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবির দায়িত্ব ছিল ক্রিকেটের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আইসিসির সঙ্গে কৌশলগত আলোচনা চালানো এবং খেলোয়াড়দের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বিসিবি কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল, অথবা উপদেষ্টাদের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এর ফলে ক্রিকেট বোর্ডের স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বকাপের বাইরে থাকা মানে শুধু একটি আসর মিস করা নয়—এটি ভবিষ্যৎ আইসিসি ইভেন্টে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করে দেবে, স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বার্থে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, এমনকি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনেও বাংলাদেশকে কম আকর্ষণীয় করে তুলবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিশ্বাসযোগ্যতা একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করার কোনো প্রবণতা এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং ব্যাখ্যা, যুক্তি আর দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে। অথচ জাতি জানতে চায়—কে এই সিদ্ধান্তের দায় নেবে? কে উত্তর দেবে তরুণ ক্রিকেটারদের ভাঙা স্বপ্নের জন্য? কে ব্যাখ্যা দেবে কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হতাশার জন্য?
বিশ্বকাপের দরজা আজ বন্ধ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামনে খুলে গেছে এক অন্ধকার পথ—যেখানে দিশাহীনতা, অনিশ্চয়তা আর আস্থাহীনতাই প্রধান সঙ্গী। এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন হবে দায় স্বীকার, বিকৃত চিন্তার পরিত্যাগ এবং ক্রিকেটকে রাজনীতি ও ব্যক্তিগত এজেন্ডা থেকে মুক্ত করার সাহসী সিদ্ধান্ত। নইলে আজ যে বিশ্বকাপ হাতছাড়া হলো, আগামীকাল হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অবৈধ ইউনূস প্রশাসন থেকে দেশ উদ্ধারে শেখ হাসিনার ৫ দফা

সন্ত্রাসের অতীত ভুলে ক্ষমতার হিসাব: জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা!

রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছে ইউনূস: আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কোটা-ভণ্ডামি উন্মোচন করলেন আফসানা বেগম

বিশ্বকাপের দরজা বন্ধ, অন্ধকারে যাত্রা বাংলাদেশের ক্রিকেটের

অন্ধ ভারতবিরোধিতার ফল: ঢাকায় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অফিস খোলা হয়েছে

চরম সংকটে বাংলাদেশের ক্রিকেট: অন্ধ ভারতবিরোধিতার বলি জাতীয় স্বার্থ

আল জাজিরায় সজীব ওয়াজেদ জয়: দেশ বাঁচাতে আওয়ামী লীগই একমাত্র বিকল্প

নিরাপত্তা ঝুঁকি: বাংলাদেশে ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত ভারতের

নোবেল বঞ্চনার ক্ষোভে ট্রাম্পের বার্তা: শান্তির দায় শেষ, এবার চাপ ও শক্তি

১০

চট্টগ্রামের জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের সংগঠিত আক্রমণ: এলিট ফোর্সের দুর্বলতা প্রকট

১১

সংবিধান ধ্বংসের আয়োজন: ইউনূসের ‘হ্যা’-এর পক্ষে প্রচারণা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার

১২

ধ্বংসাত্মক মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার নির্বাচনী নাটক বর্জনের আহ্বান সজীব ওয়াজেদ জয়ের

১৩

মব সন্ত্রাসের দায় এড়াতে যুদ্ধাপরাধীদের সহচর তাজুলের হুমকি

১৪

এডিপি বাস্তবায়নে বিপর্যয়: শেখ হাসিনার ধারাবাহিক ‍উন্নয়ন থামিয়ে ইউনূসের উল্টোযাত্রা

১৫

ডব্লিউইএফ-এর সতর্কতা: ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অপরাধ ও অবৈধ কর্মকাণ্ড

১৬

ক্রিকেটারদেরকে দেশে গুলি করে হত্যার হুমকি, অথচ ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকার

১৭

জঙ্গি কোটায় দূতাবাসে চাকরি হাদির ভাইয়ের

১৮

জুলাই ষড়যন্ত্রকারী ও সন্ত্রাসীদের রক্ষার দায়মু্ক্তি অধ্যাদেশ জারি

১৯

বিমানে দুর্নীতির মেগা প্ল্যান: বোয়িং কেনায় কমিশন বাণিজ্য, বোর্ড দখলে ইউনুসের ছক

২০