বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতায় একটি বিষয় স্বাধীনতার পর থেকেই স্পষ্ট ছিল—প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, সশস্ত্র গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতাকে বাংলাদেশ কখনোই আশ্রয় দেবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীনতার পরপরই এই নীতিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে কোনোভাবেই আঞ্চলিক ষড়যন্ত্র, সীমান্তপারের সন্ত্রাস বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার অংশ হতে দেওয়া হয়নি।
এই নীতির ধারাবাহিকতা সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে বজায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। ভারতের অখণ্ডতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সীমান্তে সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ভূমিকার ফলে বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।
এর বিপরীতে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে এই রাষ্ট্রীয় নীতি বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ভয়াবহ ও আলোচিত উদাহরণ হলো চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক কাণ্ড। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে যায়, কীভাবে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে বাংলাদেশকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ষড়যন্ত্রের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত করা হয়েছিল। ওই অস্ত্রচালান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নীতির বিপর্যয়ের ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।
আজকের প্রেক্ষাপট সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তির হচ্ছে। মৌলবাদ-সমর্থিত বর্তমান ইউনূস সরকারের আমলে আবারও রাষ্ট্রীয় নীতির জায়গায় ঢুকে পড়েছে অন্ধ ভারতবিরোধিতা। কৌশল, বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থের বদলে ভারতবিরোধী আবেগকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পথে হাঁটছে।
এই অন্ধ ভারতবিরোধিতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর প্রতি নীরব সহানুভূতি ও প্রশ্রয়ের পরিবেশ তৈরি করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ঢাকায় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বা তাদের সহযোগীদের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আজ তারা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, যোগাযোগ বাড়িয়ে সংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছে। সেই তৎপরতা অফিস বা স্থায়ী কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে—যা বাংলাদেশের জন্য এক গভীর নিরাপত্তা-ঝুঁকির আলামত।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়—যে রাষ্ট্র একবার বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্র নিজেই অস্থিতিশীলতার শিকার হয়। ১০ ট্রাক অস্ত্র কাণ্ডের মতো ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আওয়ামী লীগ সরকার এর বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করা করেছিল। কিন্তু বর্তমান অবৈধ সরকারের দায়িত্বহীনতা সেই নীতিকে অস্বীকার করছে।
আজ তাই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি আবার সেই বিপজ্জনক পথে ফিরছে, যেখানে অন্ধ ভারতবিরোধিতার নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে জায়গা দেওয়া হয়? ঢাকায় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অফিস খোলা হয়েছে বলে অনেকে দাবি করছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় নীতি ভঙ্গ করা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এখনই এই প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অনুসৃত নীতিতে ফিরে না আসলে ইতিহাস যে আবারও ভয়াবহভাবে ফিরে আসবে—এমন আশঙ্কা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
মন্তব্য করুন