যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, একাধিক আন্তর্জাতিক সংঘাত ও যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকা রাখার দাবি থাকা সত্ত্বেও নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় তিনি আর শুধু শান্তির কথাই ভাবতে বাধ্য নন। ট্রাম্পের ভাষায়, শান্তির উদ্যোগে কাজ করলেও নোবেল কমিটি তাঁকে উপেক্ষা করেছে, ফলে এখন তাঁর নীতিতে কেবল ‘শান্তি’ অগ্রাধিকার পাবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কার্যত তাঁর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বৈদেশিক নীতির কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। চিঠিতে তিনি আবারও গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তাঁর মতে, ডেনমার্কের অধীনে থাকা এই বিশাল ভূখণ্ড কেবল একটি দ্বীপ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত অঞ্চল। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা জরুরি বলে তিনি দাবি করেন।
ট্রাম্প তাঁর চিঠিতে আরও ইঙ্গিত দেন, এই ইস্যুতে কোনো দেশ বা শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ কিংবা বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের মতো পদক্ষেপও বিবেচনায় আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ শান্তির কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তে শক্তি, চাপ ও প্রভাব বিস্তারের নীতিই যে তাঁর প্রশাসনের প্রধান হাতিয়ার—এই বার্তাই তিনি স্পষ্টভাবে দিতে চেয়েছেন।
এই বক্তব্য ও অবস্থান ইউরোপজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী হিসেবে দেখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নীতিনির্ধারক মহল থেকেও জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন একতরফা ও আগ্রাসী মনোভাব দীর্ঘদিনের ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়ার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে অগ্রগতি হলেও নোবেল কমিটি তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে। তবে নরওয়ের নোবেল কমিটি বরাবরই বলে আসছে, রাজনৈতিক চাপ বা ব্যক্তিগত দাবির ভিত্তিতে নয়, বরং নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। কোনো ক্ষেত্রে প্রতীকীভাবে পুরস্কার প্রদান হলেও, তা মূল বিজয়ীর নামেই নথিভুক্ত থাকে—এই নীতিতেই তারা অটল।
সব মিলিয়ে, নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়াকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ আসলে তাঁর বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শনেরই প্রতিফলন। শান্তির ভাষা থেকে শক্তির ভাষায় ফিরে যাওয়ার এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তাঁর আগ্রাসী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে আরও টানাপোড়েনের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
মন্তব্য করুন