বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অদ্ভুত, বিপজ্জনক এবং নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে। যে সরকার নীতিগতভাবেই নিরপেক্ষ থাকার কথা, যে সরকারের দায়িত্ব কেবল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা—সেই সরকারই আজ সরাসরি একটি পক্ষের হয়ে মাঠে নেমেছে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসনের মৌলিক দর্শনকে পায়ে দলে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংশোধনের নামে একটি বিতর্কিত গণভোট আয়োজন করেছে এবং তার পক্ষে নির্লজ্জভাবে ‘হ্যা’ ভোটের প্রচারণায় নেমেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুস্পষ্ট অপব্যবহার এবং সংবিধানকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
গণভোট—এই শব্দটির আড়ালে যে নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকৃত গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। সংবিধান পরিবর্তনের মতো গুরুতর বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার কথা বলে যেভাবে প্রশাসনিক শক্তি, রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র এবং সরকারি পদমর্যাদাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিশ্ব গণতান্ত্রিক চর্চায় প্রায় অজানা। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনগণকে নির্দিষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে আহ্বান জানায়—এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিতর্কিত প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অস্থায়ী নির্বাহী পদে থেকে তিনি ভিডিও বার্তা, বক্তব্য এবং সরকারি ভাষ্য ব্যবহার করে জনগণকে ‘হ্যা’ ভোটে উদ্বুদ্ধ করছেন। অর্থাৎ যিনি রেফারি হওয়ার কথা, তিনিই খেলোয়াড়ের জার্সি পরে মাঠে নেমেছেন। এতে করে পুরো গণভোট প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। জনগণের স্বাধীন মতামত এখানে আর স্বাধীন থাকছে না; রাষ্ট্রীয় প্রভাব ও চাপের নিচে সেটিকে একটি নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব কখনোই রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। তাদের কাজ হলো একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সীমারেখা অতিক্রম করে একটি আদর্শিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। সংবিধান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গণভোট আয়োজন করে, আবার সেই গণভোটে প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানে সংবিধানকে জনগণের সম্মতির দলিল নয়, বরং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
এই গণভোটের প্রশ্নগুলোও সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী, সংসদ কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এর ফলাফল কী হবে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যার বদলে দেওয়া হচ্ছে একমুখী প্রচারণা। “নতুন বাংলাদেশ”, “সংস্কার”, “উদ্ধার”—এমন আবেগী শব্দের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে প্রকৃত সাংবিধানিক ঝুঁকি। জনগণকে সচেতন করার বদলে তাদেরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এই গণভোট আসলে মতামত জানার প্রক্রিয়া নয়; এটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তে জনগণের সিলমোহর আদায়ের কৌশল। ভোট নয়, এখানে মুখ্য বিষয় হলো স্ক্রিপ্ট—যেখানে সরকার নিজেই পরিচালক, অভিনেতা এবং বিচারক। এমন একটি ব্যবস্থায় গণতন্ত্র কেবল একটি শ্লোগানে পরিণত হয়, বাস্তবে নয়।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি নিরপেক্ষতা, আস্থা এবং আইনের শাসন। অন্তর্বর্তী সরকার যদি সেই নীতিই ভঙ্গ করে, তবে ভবিষ্যতে যে কোনো নির্বাচন বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের বিশ্বাস ভেঙে পড়বে। আজ ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, কাল হয়তো ভিন্ন মত দমনের জন্য একই কৌশল ব্যবহৃত হবে—এই আশঙ্কা অমূলক নয়।
বাংলাদেশের মানুষ অতীতে বহুবার দেখেছে, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রকে সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। তাই আজ প্রশ্ন উঠছে—এই গণভোট কি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি এটি সংবিধান দুর্বল করার আরেকটি অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লেখা হবে? অন্তর্বর্তী সরকারের এই আক্রমণাত্মক, পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান সেই প্রশ্নকেই আরো জোরালো করে তুলছে।
মন্তব্য করুন