দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, দলবদ্ধ সহিংসতা, প্রকাশ্য হামলা, ভাঙচুর ও বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড যখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে, ঠিক সেই সময় ‘মব’ শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। সমালোচকদের মতে, তার এই বক্তব্য নিছক শব্দচয়ন সংক্রান্ত কোনো সতর্কবার্তা নয়; বরং এটি সুস্পষ্টভাবে মব সন্ত্রাসকে রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশলী প্রচেষ্টা।
রোববার (১৮ জানুয়ারি ২০২৬) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন’ শীর্ষক সংলাপে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মব’ শব্দ ব্যবহারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তিনি মব সন্ত্রাস বন্ধ করার কথা বলেননি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার আহ্বান জানাননি, বরং ‘মব’ শব্দটি উচ্চারণ করাকেই সমস্যার কেন্দ্রে দাঁড় করিয়েছেন। এতে করে অপরাধের ভয়াবহতা আড়ালে চলে গেছে, সামনে এসেছে কেবল শব্দের রাজনীতি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে কার্যত যেসব দলবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে সংঘটিত হয়েছে—বাড়িঘর জ্বালানো, মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে হামলা, নারীদের লাঞ্ছনা—সেসবকে ‘মব’ হিসেবে চিহ্নিত না করার একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের ভাষায়, তাজুলের এমন বক্তব্য সরাসরি মব সন্ত্রাসীদের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করার শামিল।
তাজুল ইসলামের অতীত পরিচয় এই বিতর্ককে আরও গুরুতর করে তুলেছে। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সক্রিয় আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই ব্যক্তি আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্বে থেকে যখন মব সন্ত্রাসের ভাষাগত সংজ্ঞা নিয়েই আপত্তি তোলেন, তখন তার নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানো মানসিকতা থেকেই আজ তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধীদের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন।
সংলাপে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স তাজুল ইসলামের বক্তব্যকে ‘হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এই ধরনের বক্তব্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ভয়ংকর ইঙ্গিত বহন করে। তার মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কেউ যদি মব সন্ত্রাসের নাম উচ্চারণ করতেই নিরুৎসাহিত করেন, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে অপরাধীদের সাহস বাড়াবে এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়; বরং বর্তমান বাস্তবতায় একটি পরিকল্পিত বয়ানের অংশ। যেখানে গণঅভ্যুত্থান, গণআন্দোলন এবং মব সন্ত্রাস—এই তিনটি ভিন্ন বাস্তবতাকে গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণআন্দোলন হয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সংগঠন ও দাবির ভিত্তিতে; আর মব সন্ত্রাস জন্ম নেয় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, আইনের অনুপস্থিতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে। এই দুইয়ের পার্থক্য মুছে ফেলাই মূলত মব সন্ত্রাসকে গ্রহণযোগ্য করার পথ খুলে দেয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব হলো অপরাধের সঠিক নামকরণ করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি অবস্থান নেওয়া। কিন্তু তাজুল ইসলামের বক্তব্যে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। বরং এতে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—রাষ্ট্র মব সন্ত্রাসকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে অস্বস্তি বোধ করছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের সাবেক আইনজীবী তাজুল ইসলামের ‘মব’ শব্দবিরোধী বক্তব্য দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শব্দ নয়, অপরাধই যেখানে মূল সমস্যা—সেখানে শব্দের আড়ালে অপরাধীদের রক্ষা করার যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা ইতিহাস ও জনতার আদালতে কঠোরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকবে।
মন্তব্য করুন