নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
জুলাই আন্দোলনের নামে সংঘটিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডকে কার্যত বৈধতা দেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে সরকার অনুমোদিত নতুন অধ্যাদেশ। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ নামে জারি হতে যাওয়া এই আইনকে অনেকেই দেখছেন একটি ভয়ংকর নজির হিসেবে, যেখানে সংগঠিত সন্ত্রাসী মবের অপরাধ ঢেকে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র নিজেই ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ঘোষণামতে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে তথাকথিত ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’-এর নামে সংঘটিত কার্যক্রমের জন্য আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়—যে সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেসব ঘটনায় জড়িতদের বড় একটি অংশ আইনের আওতার বাইরে চলে যাবে।
বাস্তবতা হলো, জুলাই আন্দোলনের সময় অনেক জায়গায় কোনো গণআন্দোলনের বৈশিষ্ট্যই দেখা যায়নি। বরং সংগঠিত সন্ত্রাসী মব রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু ক্ষেত্রে এসব হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর এবং ভয়ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত। অথচ নতুন এই অধ্যাদেশে সেই মবকে ‘গণ-অভ্যুত্থানকারী’ আখ্যা দিয়ে দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিদ্যমান ফৌজদারি মামলাগুলো প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং ভবিষ্যতে নতুন মামলা না করার সিদ্ধান্ত। এতে করে খুন, আগুন, ভাঙচুর ও সন্ত্রাসের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র যদি আগেই ঘোষণা দেয় যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের অপরাধীরা বিচার থেকে মুক্ত থাকবে, তাহলে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আইন উপদেষ্টা বলছেন, ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণ স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এই আইনের আওতায় পড়বে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একটি সন্ত্রাসী মবের হামলায় নিহত ব্যক্তির মৃত্যু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়েছে, নাকি ব্যক্তিগত বিদ্বেষে—এটা নির্ধারণ করবে কে? একই সহিংস ঘটনার ভেতরে রাজনৈতিক স্লোগান আর ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা—দুটোই থাকতে পারে। সেখানে দায়মুক্তির এমন অস্পষ্ট ব্যাখ্যা অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করবে।
আরও বিস্ময়কর হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে, যে কমিশন বর্তমানে কার্যকরই নেই। অর্থাৎ আপাতত ভুক্তভোগীদের জন্য কোনো বাস্তব প্রতিকার ব্যবস্থাই থাকছে না। ভবিষ্যতে কমিশন গঠন হলেও, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কতটা সম্ভব—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অধ্যাদেশ একটি ‘কালো আইন’, যা গণতন্ত্র রক্ষার নামে সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন রাষ্ট্র সন্ত্রাসী মবকে রাজনৈতিক আন্দোলনের মোড়কে রক্ষা করে, তখন সহিংসতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। আজ যারা ‘গণ-অভ্যুত্থানকারী’ হিসেবে দায়মুক্তি পাচ্ছে, আগামীকাল তারাই আরো বড় সহিংসতার সাহস পাবে।
আইনের শাসন কখনো দায়মুক্তির ওপর দাঁড়ায় না। সমাজ ও রাষ্ট্র টিকে থাকে আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। খুনিকে খুনি না বলে আন্দোলনকারী বলা, সন্ত্রাসী মবকে রাজনৈতিক প্রতিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করা—এসব কৌশলে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।
এই অধ্যাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ক্ষমতার পালাবদলের নামে সহিংসতা করলে শাস্তি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা মিলবে। এমন বার্তা কোনো সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছুই নয়।
মন্তব্য করুন