জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে ঘিরে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির নীলনকশা। নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা যতটা উন্নয়নমুখী বলে প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তবে তার আড়ালে চলছে বোর্ড দখল, সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কমিশন বাণিজ্যের প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং ইউনুস সরকারের প্রত্যক্ষ আশ্রয়ে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতির মেগা প্ল্যান।
সাম্প্রতিক সময়ে বিমানের পরিচালনা পর্ষদে একযোগে যুক্ত করা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদকে। এদের কারওই বেসামরিক বিমান চলাচল, এভিয়েশন ব্যবস্থাপনা বা আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ ক্রয় সংক্রান্ত পেশাদার অভিজ্ঞতা নেই। তবুও ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁদেরকে বোর্ডে বসানো হয়েছে, যখন বোয়িং কেনার মতো হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সামনে আনা হচ্ছে।
এই নিয়োগের সময় ও ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, বোয়িং কেনার মতো বড় প্রকল্প মানেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, পরামর্শক নিয়োগ, মধ্যস্বত্বভোগী এবং বিপুল অঙ্কের কমিশনের সম্ভাবনা। বোর্ডে প্রভাবশালী প্রশাসনিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি সেই সিদ্ধান্তগুলো নির্বিঘ্নে অনুমোদনের পথ তৈরি করে দেয়—যা দুর্নীতির জন্য আদর্শ কাঠামো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরো বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের ভূমিকা। মন্ত্রী পর্যায়ের একজন ব্যক্তি হয়েও তাকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে এটি একটি অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত। সমালোচকদের মতে, এটি শুধু মর্যাদাগত বিষয় নয়; বরং বোর্ডকে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি কৌশল, যাতে বড় ক্রয় ও আর্থিক সিদ্ধান্তে কোনো বাধা না থাকে।
সরকারি ভাষ্যে এসব নিয়োগকে ‘জনস্বার্থে’ করা হয়েছে বলা হলেও বাস্তবতায় বিমানের দীর্ঘদিনের লোকসান, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সমস্যার সমাধানে কোনো পেশাদার এভিয়েশন বিশেষজ্ঞকে সামনে আনা হয়নি। বরং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বসিয়ে বোর্ডকে কার্যত একটি অনুমোদন যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।
অভিজ্ঞ মহলের ভাষায়, এটি একটি পুরোনো কিন্তু কার্যকর কৌশল—আগে বোর্ড দখল, তারপর বড় প্রকল্প অনুমোদন, এরপর পর্দার আড়ালে কমিশন ও সুবিধা ভাগাভাগি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কোনো সাধারণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জাতীয় মর্যাদা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে এভাবে অযোগ্য ও অপ্রাসঙ্গিক নিয়োগের মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠন করা মানে প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া।
সব মিলিয়ে বোয়িং কেনার নামে বিমানে যা ঘটছে, তা আর কাকতালীয় নয়। এটি স্পষ্টভাবে কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার একটি সুপরিকল্পিত ছক। প্রশ্ন একটাই—এই দুর্নীতির মেগা প্ল্যানের দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে, আর এর মূল্য কে পরিশোধ করবে?
মন্তব্য করুন