বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদা ভাট্টি। এক ভিডিও বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, গত ১৭ মাসে দেশে প্রায় ৬ হাজার মানুষ গুম বা নিখোঁজ হয়ে গেছে, যাদের কোনো আইনগত হিসাব রাষ্ট্র দিতে পারছে না। এই পরিস্থিতিকে তিনি রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে পরিচালিত পরিকল্পিত “এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স” হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন—এটি কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং একটি ভয়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রতিফলন।
বক্তব্যের শুরুতেই মাসুদা ভাট্টি স্পষ্ট করে বলেন, এই নিখোঁজদের বড় একটি অংশ কোনো অপরাধী বা বিচ্ছিন্ন নাগরিক নয়; বরং তারা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংগঠনের পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শ্রেণিকে লক্ষ্য করেই এই গুম ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটছে। তার ভাষায়, “এরা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি—এরা রাষ্ট্রের হাতেই উধাও হয়েছে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি রাষ্ট্র জানে না মানুষ কোথায় যাচ্ছে, তাহলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর অস্তিত্বই বা কোথায়?
এই প্রেক্ষাপটে তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দেওয়াকে তিনি “অতিমাত্রায় বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া” বলে অভিহিত করেন। মাসুদা ভাট্টির প্রশ্ন—যখন একের পর এক মানুষ গুম হচ্ছিল, তখন এই সংস্থাগুলো কোথায় ছিল? হাজার হাজার পরিবার যখন অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক বিবৃতি কেন আসেনি? তার মতে, এখন চিঠি লিখে দায় সারার সুযোগ নেই, কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষত ইতোমধ্যে গভীর হয়ে গেছে।
বক্তব্যে তিনি বর্তমান শাসনামলে সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়নের একাধিক উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ এবং শাহরিয়ার কবিরের মতো পরিচিত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবীণ সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়াকেও তিনি স্পষ্টভাবে বাকস্বাধীনতা দমনের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “এগুলো বিচ্ছিন্ন মামলা নয়—এগুলো একটি ভয় তৈরির কৌশল।”
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে তিনি বর্তমান সরকারের জারি করা তথাকথিত ‘ইন্ডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করেন। মাসুদা ভাট্টির মতে, ৫ আগস্টের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে এই অধ্যাদেশ কার্যত বৈধতা দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারহীনতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দায়মুক্তি পাবে অপরাধী এবং প্রশ্নবিদ্ধ হবে পুরো বিচার ব্যবস্থা। এমনকি মানবাধিকার কমিশনকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে দেশে উগ্রবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটছে বলেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাসুদা ভাট্টি। তার বক্তব্যে উঠে আসে জামায়াত-ই-ইসলামী, হিজবুত তাহরীর এবং আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট মতাদর্শের তৎপরতার কথা। তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি দুর্বল ও ভয়নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা চরমপন্থার জন্য সবচেয়ে উর্বর জমি তৈরি করে দেয়, যার ফল ভোগ করতে হয় পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে।
সবশেষে মাসুদা ভাট্টি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মূলত ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে। গুম হওয়া ৬ হাজার মানুষের তালিকা কেবল একটি সংখ্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি পতনের দলিল। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকবে, যা কোনো আন্তর্জাতিক চিঠি বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সারবে না। তার মতে, সত্যিকার পরিবর্তন আসতে পারে কেবল জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই।
মন্তব্য করুন