হোসেন মুহম্মদ ইমাম
কিছু ছবি শুধু মুহূর্ত ধারণ করে না, ইতিহাসের একটি মানসিকতা উন্মোচন করে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের ছবি ঠিক তেমনই একটি দলিল হয়ে উঠেছে। বুধবার (২৮ জানুয়ারি ২০২৬) সেনানিবাসে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা গেছে সেনাপ্রধানের সঙ্গে হাঁটতে—কিন্তু বিষয়টি কেবল পাশাপাশি হাঁটা নয়। ছবিতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তিনি সেনাপ্রধানের ইউনিফর্মের হাতা ধরে রেখেছেন। এই দৃশ্যই দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক, সমালোচনা ও প্রশ্নের ঝড় তুলেছে।
রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, সেনানিবাসের মতো সর্বোচ্চ শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংবেদনশীল এলাকায় প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ধারিত নিয়মে পরিচালিত হয়। সেখানে প্রধান উপদেষ্টার জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও সহায়তা কাঠামো—এসএসএফ, প্রটোকল কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা—সবই উপস্থিত ছিল। ফলে এটি কোনো অসুস্থতা বা ভারসাম্যহীনতার কারণে সহায়তা নেওয়ার দৃশ্য নয়। বরং এটি ছিল সচেতন, দৃশ্যমান এবং প্রতীকী একটি আচরণ।
সেনাপ্রধান কোনো ব্যক্তিগত সহচর নন। তাঁর ইউনিফর্ম কেবল পোশাক নয়—এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সামরিক শৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রতীক। সেই ইউনিফর্মের হাতা ধরে রাখা মানে প্রতীকীভাবে সেই শৃঙ্খলাকে ব্যক্তিগত আবেগ ও ইমেজ নিয়ে রাজনীতি করা। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে, তাও আবার সেনানিবাসের ভেতরে, এমন আচরণ প্রটোকল ভঙ্গের পাশাপাশি দায়িত্ববোধের গভীর ঘাটতির প্রকাশ।
এই একটি দৃশ্যই ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রবণতাকে আরও নগ্নভাবে সামনে আনে। তিনি নিয়ম-কানুনে অভ্যস্ত নন—বা অভ্যস্ত হলেও মানতে অনিচ্ছুক। যা খুশি বলা, যা খুশি করা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ব্যক্তিগত মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা—এটাই যেন তাঁর আচরণের স্বাক্ষর। মুখে নৈতিকতার কথা, কাজে নিয়মভাঙা—এই দ্বিচারিতাই তাঁকে ক্রমে একজন ভণ্ড ও দায়িত্বহীন রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ‘মানবিক মুহূর্ত’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে টানাপোড়েন ও অস্বস্তির কথা প্রকাশ্যে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সেনানিবাসে এমন ঘনিষ্ঠ দৃশ্য অনেকের কাছেই নির্বাচন-পূর্ব একটি পরিকল্পিত ইমেজ স্ট্যান্ট হিসেবে ধরা পড়ছে—যেন দেখানো যায়, বাস্তবে যা নেই, তা আছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক দেখানোর এই কৃত্রিম প্রচেষ্টা রাষ্ট্রীয় শালীনতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইউনূসের অবস্থান আজ আর আগের মতো নেই। এক সময় যিনি বাংলাদেশের পরিচয়ে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, নিয়মিত বিদেশ সফর করতেন, বক্তৃতা দিতেন—আজ তিনি কার্যত সেই জায়গা থেকে সরে গেছেন। আগের মতো মাসে মাসে বিদেশ সফর নেই, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁকে নিয়ে আগ্রহ ও আস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ বিশ্ব রাজনীতি আবেগে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায় চলে। আর অসংলগ্ন বক্তব্য, নিয়মভাঙা আচরণ ও দ্বিচারিতা সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ভেঙে দিয়েছে।
ইউনূসের অপশাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সাধারণ নাগরিকদের ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীরা যে মাত্রার অবমাননা, সন্দেহ ও ভিসা প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হচ্ছেন, তা নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিসা আবেদন বাতিল হওয়া এখন অনেকের কাছে ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন ব্যক্তির দায়িত্বহীন নেতৃত্ব ও ভণ্ডামির দায় কেন দেশের কোটি মানুষের কাঁধে এসে পড়বে—এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে করুণ দিকটি ধরা পড়ছে ইউনূসের তথাকথিত সমর্থক তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেনজি’দের মধ্যে। আবেগে ভেসে যাঁরা তাঁকে পরিবর্তনের প্রতীক ভেবেছিল, আজ তারাই বাস্তবতার কঠিন ধাক্কায় হতাশ। বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি বা সুযোগের স্বপ্ন নিয়ে যারা আশাবাদী হয়েছিল, তারা এখন হতাশায় মাথা ঠুকছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই স্পষ্ট—এক সময়ের উচ্ছ্বাস আজ পরিণত হয়েছে ক্ষোভ, হতাশা ও আত্মপ্রবঞ্চনার স্বীকারোক্তিতে।
ড. ইউনূস যে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিকতার ইমেজ বিক্রি করেছিলেন, তা আজ শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবতা প্রমাণ করেছে—ব্যক্তির ব্র্যান্ড দিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায় না। নিয়ম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ ছাড়া রাষ্ট্র কেবল দুর্বলই হয় না, আন্তর্জাতিক পরিসরে অপমানিতও হয়। সেনাপ্রধানের ইউনিফর্মের হাতা ধরে হাঁটার ছবি তাই শুধু বিতর্ক নয়—এটি একটি উদাহরণ মাত্র।
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিগত পরীক্ষাগার নয়। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ইমেজ ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পও না। এখানে প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি রাষ্ট্রের বার্তা বহন করে। আর সেই বার্তা যদি হয় দায়িত্বহীনতা ও ভণ্ডামির, তবে তার মূল্য দিতে হয় পুরো দেশকে। ইউনূস সেই মূল্যই প্রতিদিন বাড়িয়ে চলেছেন—এই বাস্তবতাই আজ আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশ ভাবনা
মন্তব্য করুন