বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল ঘৃণার প্রতীক হয়ে আছে। মীর জাফর, মোশতাক, জিয়া যেমন বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দ, তেমনি সমসাময়িক রাজনীতিতে সেই কলঙ্কিত ধারার আধুনিক প্রতিনিধিদের একজন হিসেবে উঠে আসছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইয়া। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আস্থা ও বিশ্বাসে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার যে নজির তিনি স্থাপন করেছেন, তা শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসভঙ্গ নয়—এটি সরাসরি জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
কুমিল্লার এই ইকবাল করিম ভূইয়াকে শেখ হাসিনা সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও আনুগত্যের প্রত্যাশায়। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সেই আস্থার প্রতিদান তিনি দিয়েছেন ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজিনার সঙ্গে আঁতাত করে সাংবিধানিক সরকার উৎখাতের নীলনকশা আঁকছিলেন এই ব্যক্তি। নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে বিদেশি ইশারায় রাষ্ট্রক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের সেই ষড়যন্ত্র এতটাই বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাকে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখতে হয়।
এই ক্যু প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল—শুধু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের দৃঢ় অবস্থানের কারণে। না হলে বাংলাদেশ হয়তো ২০১৪ সালেই আরেকটি অগণতান্ত্রিক অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করত। সেই ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের ক্ষত আজও ইকবাল করিম ভূইয়ার ভেতরে জ্বলছে বলেই মনে করেন অনেকেই।
আজ সেই একই ব্যক্তি নির্লজ্জভাবে শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আক্রমণ করছে। যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও উন্নয়নে যুগান্তকারী অগ্রগতি এনেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে—তাকে ফ্যাসিস্ট বলার দুঃসাহস আসছে কোথা থেকে? উত্তর একটাই—ক্ষমতা হারানোর ক্ষোভ, বিদেশি প্রভুদের মন রক্ষা করার তাগিদ এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে আদর্শিক সখ্যতা।
ফেসবুকে প্রকাশিত তার সাম্প্রতিক লেখাটি সেই গোপন পরিচয়কেই উন্মোচন করেছে। সেখানে তিনি ভারতবিরোধিতা ও তথাকথিত সার্বভৌমত্বের বুলি আওড়ে মূলত মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করার সাফাই গেয়েছেন। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার যে আহ্বান তিনি জানাচ্ছেন, তা সরাসরি জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আঘাত।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—কার স্বার্থে এই ভাষা? কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই সাবেক সেনাপ্রধান এতটা বেপরোয়া? ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, মোশতাকের উত্তরাধিকারী চক্র এবং বিদেশি প্রভাবাধীন গোষ্ঠীগুলোর ভাষার সঙ্গে ইকবাল করিম ভূইয়ার বক্তব্যের অদ্ভুত মিল। যেন একই স্ক্রিপ্ট, শুধু কণ্ঠ বদলেছে।
একজন সাবেক সেনাপ্রধানের কাছ থেকে এমন বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত নয়, এটি সামরিক শপথ ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের সরাসরি অবমাননা। বিশ্বব্যাপী সামরিক নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত হলেও একজন সেনাপ্রধান তার সাবেক সর্বাধিনায়ক ও সাংবিধানিক সরকারের বিরুদ্ধে এভাবে অবস্থান নিতে পারেন না। এটি চরম অপেশাদারত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রতি বেইমানির শামিল।
বাংলাদেশের জনগণ স্পষ্ট জানে—আওয়ামী লীগ কোনো বিদেশি শক্তির করুণায় টিকে থাকা দল নয়। এই দল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে। জনগণের প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগ বারবার ফিরে এসেছে এবং আবারও ফিরবে। ইকবাল করিম ভূইয়ার মতো কোনো বিশ্বাসঘাতক, আধুনিক মীর জাফর ও বিদেশি মদদপুষ্ট ষড়যন্ত্রকারী সেই ঐতিহাসিক সত্য বদলাতে পারবে না।
ইতিহাস সাক্ষী—বিশ্বাসঘাতকরা সাময়িকভাবে উচ্চকণ্ঠ হতে পারে, কিন্তু শেষ বিচারে তারা স্থান পায় ঘৃণার পাতায়। “পুনরুদ্ধার হওয়া ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে” ইকবাল করিম ভূইয়ার মতো গণশত্রুদের ভূমিকার হিসাব জাতি নেবেই। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও উন্নয়নের প্রশ্নে আপস নেই—আর সেই আপসহীনতার পথেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
মন্তব্য করুন