ডেস্ক রিপোর্ট:
জনম্যান্ডেটবিহীন অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। সর্বশেষ অভিযোগটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিদেশি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মতো গুরুতর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই সরকারের ভেতরে বিদেশি কোম্পানির লবিস্টদের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন—এবং সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্রের স্বার্থে নয়, বরং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত লাভের হিসাব থেকেই।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে—ইউনূস সরকার যে সংস্কার, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার কথা বলে ক্ষমতায় বসেছিল, বাস্তবে তার সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে যাদের আনা হয়েছে, তারা সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন না; বরং বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করানো, দরকষাকষি চালানো এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নীতিকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করতেই অধিক সক্রিয়। এই অস্বাভাবিক আগ্রহ ও তৎপরতা কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সমালোচকদের মতে, এখানে মূল প্রশ্ন হলো—এই লবিস্টদের এমন দাপটের সুযোগ কে করে দিচ্ছে? অভিযোগকারীদের স্পষ্ট উত্তর—ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই। প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান ব্যবহার করে তিনি একদিকে ‘অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’র মুখোশ পরছেন, অন্যদিকে সরকারের ভেতরে এমন একটি বলয় তৈরি করছেন, যেখানে বিদেশি কোম্পানি ও রাষ্ট্রের স্বার্থ এক সুতোয় বাঁধা পড়ছে ব্যক্তিগত লাভের হিসাবে।
এই প্রেক্ষাপটে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়ে আলোচনা ও সম্ভাব্য চুক্তির পথে এগোচ্ছে, তা আরও সন্দেহ ঘনীভূত করছে। জনসমর্থনহীন, অস্থায়ী একটি সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিক ও রাজনৈতিক এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। অথচ এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—সবই নাকি ‘চলমান প্রক্রিয়া’। সমালোচকদের মতে, এটি দায় এড়ানোর পরিচিত কৌশল ছাড়া কিছু নয়।
একই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও প্রশাসনে ব্যাপক পদোন্নতি ও বদলির সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউনূস সরকার প্রমাণ করেছে—তাদের কাছে গণতান্ত্রিক রীতি বা প্রতিষ্ঠিত প্রথার কোনো মূল্য নেই। তফসিল ঘোষণার পরদিনই হাজার হাজার শিক্ষককে পদোন্নতি, পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে একযোগে বদলি, এরপর যুগ্ম সচিবদের অতিরিক্ত সচিব করা—সব মিলিয়ে প্রশাসনকে নিজেদের পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়ার তৎপরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সব সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এর সঙ্গে বিদেশি স্বার্থের যোগসূত্র রয়েছে। কারণ, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের অনুগতদের বসাতে পারলেই বড় চুক্তি, প্রতিরক্ষা কেনাকাটা কিংবা আর্থিক বরাদ্দে প্রশ্নহীনভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া সহজ হয়। এখানেই লবিস্টদের ভূমিকা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনকালীন বা অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে—এটি কোনো লিখিত আইন না হলেও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটি রীতি। যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বহু দেশে এই রীতির কঠোর অনুসরণ দেখা যায়। অথচ ইউনূস সরকার সেই রীতিকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করার মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের প্রশ্ন তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—‘এই সরকারের কি বিদেশি কোম্পানি বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে? নাকি ব্যক্তিগত লাভের হিসাবেই এই তাড়াহুড়া?’ তার মতে, প্রতিরক্ষা চুক্তি, বড় অঙ্কের কেনাকাটা কিংবা অর্থ বরাদ্দের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার এই সরকারের নেই। এসব কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ না হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আরও উদ্বেগজনক হলো—এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশের নীরবতা। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা ইউনূস সরকারকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে এবং বিদেশি লবিস্টদের জন্য মাঠ আরও উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে যে চিত্রটি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো—অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বকে ব্যবহার করছে ক্ষমতা ও প্রভাবের বাণিজ্যিকীকরণের জন্য। রাষ্ট্রের স্বার্থ নয়, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত লাভই যেন হয়ে উঠেছে তাদের মূল চালিকাশক্তি। আর সেই কারণেই আজ সরকারের ভেতর থেকেই উঠছে ভয়াবহ অভিযোগ—বিদেশি লবিস্টদের দৌরাত্ম্য ইউনূসের প্রশ্রয়েই সম্ভব হয়েছে।
এই বাস্তবতায় দেশের গণতন্ত্র, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষায় একমাত্র পথ হলো—এই অনির্বাচিত ও বিতর্কিত শাসনের অবসান এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত, দায়বদ্ধ সরকারের কাছে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর।
মন্তব্য করুন