ডেস্ক রিপোর্ট:
নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতির বন্যা নতুন কিছু নয়। তবে সেই প্রতিশ্রুতি যখন বাস্তবতা, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন তা আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনারও জন্ম দেয়। বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলো ঠিক সেই বাস্তবতার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ।
রোববার (৮ জানুয়ারি) ঢাকা–১৭ আসনের ইসিবি চত্বরে আয়োজিত এক পথসভায় তারেক রহমান ঘোষণা দেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে রাজধানী ঢাকায় কমপক্ষে ৪০টি খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব মাঠ শিশু ও কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করবে এবং নগরবাসীর জন্য হাঁটার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করবে। বক্তব্যটি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও রাজধানীর বাস্তব চিত্র সামনে রেখে এ ঘোষণাকে অনেকেই অবাস্তব ও জনতুষ্টিমূলক বলে অভিহিত করছেন।
ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। যেখানে একটি খেলার মাঠ রক্ষা করতেই বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হয়, সেখানে নতুন করে ৪০টি মাঠ নির্মাণের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। নেটিজেনরা ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট, কার্টুন ও মিমের মাধ্যমে প্রশ্ন তুলছেন—এই মাঠগুলো কোথায় হবে? বস্তি উচ্ছেদ করে, সরকারি ভবন ভেঙে?
সমালোচকদের মতে, এই ঘোষণা তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বক্তব্যের ধারাবাহিক অংশ—যেখানে বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে আবেগঘন ও পপুলিস্ট বক্তব্য বেশি প্রাধান্য পায়। তারা মনে করছেন, বিএনপি নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবেই বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই না করেই বড় বড় সংখ্যা ও আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে।
এটি প্রথমবার নয়। এর আগেও তারেক রহমান একাধিক উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেগুলোর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ লাগানোর ঘোষণা তার অন্যতম উদাহরণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ লাখ গাছ রোপণ করতে হবে—যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব। তবুও এ ধরনের প্রতিশ্রুতি তার রাজনৈতিক বক্তৃতায় স্থান পেয়েছে।
একইভাবে তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর কথা বলেছেন, যার আওতায় চার কোটি পরিবারকে মাসিক ভাতা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ একাধিক প্রকল্প চালু রয়েছে। সমালোচকদের মতে, নতুন কোনো কাঠামোর কথা না বলে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অস্বীকার করাই এসব বক্তব্যের মূল বৈশিষ্ট্য।
তারেক রহমানের ঘোষণায় আরও রয়েছে কুমিল্লায় নতুন ইপিজেড স্থাপনের প্রতিশ্রুতি—যেখানে ইতোমধ্যে একটি সফল ইপিজেড কার্যকর রয়েছে। একইভাবে নীলফামারীতে নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও আলোচনায় এসেছে, যদিও সেখানে বর্তমানে একটি মেডিকেল কলেজ চালু আছে। এসব ঘোষণাকে বিশ্লেষকেরা তথ্যগত অসচেতনতা কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যে অতিরঞ্জনের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা উঠে এসেছে উন্নয়ন বর্ণনার প্রসঙ্গে। গত দেড় দশকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ অবকাঠামো, মেগা প্রকল্প, ডিজিটাল সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তারেক রহমানের বক্তব্যে এসব অর্জনের স্বীকৃতি অনুপস্থিত। বরং ‘বিদ্যুতের আগে চাই খুঁটি’ ধরনের পুরোনো রাজনৈতিক বাগধারার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
নাগরিক সমাজের মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে স্বল্পমেয়াদে আলোচনার জন্ম দিলেও দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে। কারণ ভোটাররা এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, তার বাস্তবায়নযোগ্যতা, অতীত অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার স্বচ্ছতা দেখতে চান।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে ৪০টি খেলার মাঠ নির্মাণের ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে নাগরিকবান্ধব মনে হলেও, বাস্তবতার নিরিখে তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক বক্তব্য ততই তীব্র হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এসব প্রতিশ্রুতিকে ভোটাররা কতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন, তার প্রতিফলন ঘটবে ব্যালট বাক্সেই।
মন্তব্য করুন