অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সদ্য অপসারিত পরিচালক আফসানা বেগমের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতা সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে নীতিগত অবস্থান ও মতভিন্নতার কারণে হঠাৎ চাকরি হারানোর ঘটনাকে সামনে এনে আফসানা বেগম যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তাতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তথা ইউনূস সরকারের নীতি, কোটা প্রশ্নে অবস্থান এবং ক্ষমতার ব্যবহার—সবকিছুই বারবার আলোচনায় আসছে। আফসানা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, কথায় সংস্কার আর বাস্তবে স্বজনপ্রীতি ও সুবিধাবাদ—এই দ্বিচারিতাই উন্মোচিত হয়েছে।
ফেসবুকের মাধ্যমে সিরিজ পোস্টে (https://www.facebook.com/share/p/1F4TAQeFuM/) আফসানা বেগম লিখেছেন, কোটা ইস্যুতে ন্যায়বিচার ও মেধাভিত্তিক প্রশাসনের কথা বলে যে নৈতিক উচ্চতা দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং ভিন্নমত সহ্য না করার প্রবণতা এবং “পছন্দের মানুষ বসানো”র সংস্কৃতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে তিনি যে প্রশাসনিক চাপ, অযৌক্তিক নির্দেশনা এবং নীতিগত অসংগতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা তাঁর মতে সংস্কৃতি খাতকে শক্তিশালী করার বদলে নিয়ন্ত্রণের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে তাঁর অপসারণকে অনেকেই কেবল একটি প্রশাসনিক বদলি হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি ভিন্নমত দমনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। আফসানা বেগম বলছেন, তিনি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা বা পদ আঁকড়ে ধরতে চাননি; চেয়েছেন নীতিগত স্বচ্ছতা। কিন্তু সেই স্বচ্ছতার সঙ্গেই নাকি সংঘাত হয়েছে উপদেষ্টার ঘোষিত অবস্থানের। কোটা প্রশ্নে ন্যায়বিচারের কথা বলা হলেও, বাস্তবে সিদ্ধান্ত হয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রের পছন্দ-অপছন্দে—এই অভিযোগই তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।
সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা বৃহত্তর এক সংকটের প্রমাণ দেয়। যেখানে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে; যেখানে নৈতিকতার কথা শোনা যাচ্ছে, সেখানে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা অনুপস্থিত। আফসানা বেগমের অভিজ্ঞতা সেই বৈপরীত্যকে স্পষ্ট করেছে—কথা ও কাজের ফারাককে সামনে এনেছে। তাঁর মতে, সংস্কৃতি খাতকে দলীয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়ে আবদ্ধ করলে সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আর আস্থা ভেঙে পড়ে।
এদিকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সরাসরি জবাব আসেনি। নীরবতাই যেন বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করছে। সমালোচকেরা বলছেন, যদি সত্যিই সংস্কার ও ন্যায্যতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ নয়—বরং যুক্তি ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হওয়া উচিত। আফসানা বেগমের উত্থাপিত প্রশ্নগুলো তাই ব্যক্তিগত নয়; এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও সাংস্কৃতিক প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনায় “কোটা ভণ্ডামি” নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি পদ হারানোর গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, নীতি ও সংস্কৃতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক বড় প্রশ্ন—সংস্কার কি কেবল ভাষণে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবেও তার প্রতিফলন ঘটবে? আফসানা বেগমের বক্তব্য সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই উন্মোচনের পর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পথে হাঁটেন কিনা, নাকি নীরবতাই হয়ে থাকবে তাদের উত্তর।
মন্তব্য করুন