Hmimam
৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২:৪২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বিএনপি-জামায়াত সরকারের অপারেশন ক্লিন হার্টের দায়মুক্তি ছিল হত্যার লাইসেন্স: সাবেক সেনাপ্রধান

ডেস্ক রিপোর্ট:
বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের সময় পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এ অংশগ্রহণকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘হত্যার লাইসেন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ডিজিএফআইয়ের হাতে গুম ও হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রোববার (৮ জানুয়ারি) দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বেঞ্চে অপর বিচারপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ। এই জবানবন্দির মধ্য দিয়েই সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষ্যে সাবেক এই সেনাপ্রধান সেনাবাহিনীতে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি কীভাবে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

‘আইকেবি’ নামে পরিচিত ইকবাল করিম ভূঁইয়া ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে হত্যার প্রবণতা নতুন নয়; বরং স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে এর সূচনা হয়েছে। তবে গুমের সংস্কৃতি পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ২০০৮ সাল থেকে খুনের ঘটনা শুরু হয়েছে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সেনাবাহিনীকে ক্যাম্পের বাইরে মোতায়েন করা হয়। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে এনে সেনাক্যাম্পে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হতো, যার ফলে কিছু মানুষের মৃত্যু ঘটে। যদিও এসব ঘটনা সংখ্যায় সীমিত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং পরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলোকে ‘নিয়মিত’ করার চেষ্টা করা হয় বলে দাবি করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক অভিযানের সময় সংঘটিত মৃত্যুর ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের নজরে আসা ঘটনাগুলোতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বলেন, প্রশিক্ষণপর্বে সেনা সদস্যদের ‘ডিহিউম্যানাইজ’ করা হয়—যাতে তারা মানুষকে মানুষ নয়, বরং ‘টার্গেট’ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির লক্ষ্যবস্তুর ওপর গুলি চালানোর মাধ্যমে মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কারণেই সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো উচিত ছিল না বলে তিনি মত দেন।

এই প্রেক্ষাপটেই তিনি ২০০৩ সালে র‍্যাব গঠনের সিদ্ধান্তকে ‘মারাত্মক ও ভয়াবহ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, সেনা সদস্যদের যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা র‍্যাবের মতো বাহিনীতে নিয়োগের জন্য উপযোগী ছিল না। তিনি জানান, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে র‍্যাবের মাধ্যমে একাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে, যার আগেও অপারেশন ক্লিন হার্ট চলাকালে ব্যাপক হত্যার ঘটনা ঘটেছিল।

উল্লেখ্য, বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে দায়মুক্তি দিতে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করা হয়। প্রায় এক যুগ পর এক রিট মামলার রায়ে হাই কোর্ট ওই আইনকে সংবিধানবিরোধী ও বাতিল ঘোষণা করে।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, সেনাসূত্র অনুযায়ী ক্লিন হার্ট অভিযানে ১২ জন হৃদ্‌রোগে মারা যান বলে দাবি করা হলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ জন। পরবর্তীতে অভিযানে জড়িত সবাইকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়, যা কার্যত হত্যার জন্য আইনি ছাড়পত্র প্রদান ছাড়া কিছুই নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই কার্যত দেশের ‘মুখ্য নিয়ন্ত্রকে’ পরিণত হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাবেক সেনাপ্রধান। তার ভাষায়, ওই সময় বিভিন্ন ব্যক্তি—মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাসহ—তুলে এনে সেলে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির তারেক রহমানকেও সে সময় তুলে এনে নির্যাতন করা হয়। এর মধ্য দিয়েই বেসামরিক ব্যক্তিদের গুম করে আটকে রাখার একটি ভয়াবহ অভ্যাস গড়ে ওঠে এবং বাহিনীর মধ্যে এই ধারণা জন্ম নেয় যে, যা ইচ্ছা করা যাবে এবং শেষ পর্যন্ত কেউই জবাবদিহির মুখে পড়বে না।

২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বৃদ্ধি নিয়ে সৃষ্ট সংঘাতের পর জরুরি অবস্থা জারির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই সময় সেনাসদস্যদের আচরণ ও মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা বাড়ে, আধিপত্যবোধ তৈরি হয়, সিনিয়র–জুনিয়রের মধ্যে বিভাজন গভীর হয়, নগদ লেনদেনের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে এবং ঊর্ধ্বতনদের আদেশ অন্ধভাবে পালনের প্রবণতা জেঁকে বসে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সংঘটিত পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা ও ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। বিদ্রোহ দমনের পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরীণ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয় এবং সেই সময় র‍্যাব ও সামরিক সদস্যদের নির্যাতনে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্য মারা যান বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ধারণা দেয়। পরে আদালতের রায়ে পিলখানা হত্যা মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

সাবেক এই সেনাপ্রধান মত দেন, বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগবিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়, সিনিয়র–জুনিয়র বিভাজন আরও গভীর হয়, পেশাদার কর্মকর্তাদের সরিয়ে অনুগতদের প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করে বাহিনীটিকে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলা হয়। (সূত্র: বিডিনিউজ)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে ৪০টি খেলার মাঠ করা হবে: তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কি তামাশা?

বিএনপি-জামায়াত সরকারের অপারেশন ক্লিন হার্টের দায়মুক্তি ছিল হত্যার লাইসেন্স: সাবেক সেনাপ্রধান

জেলহত্যা চলমান: ইউনূস-বর্বরতায় সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু

জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ ধ্বংস হবে, তাদেরকে ভোট দেওয়া নাজায়েজ: হেফাজত

বন্দরে আন্দোলন: ‘মহাবিপর্যয়’ এড়াতে দ্রুত সমাধানের আহ্বান ১০ ব্যবসায়ী সংগঠনের

বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দাবিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সামনে মানববন্ধন

রাষ্ট্র নয়, নিজের স্বার্থ আগে: ইউনূসের প্রশ্রয়ে সরকারের ভেতর বিদেশি লবিস্টদের দৌরাত্ম্য

অবৈধ শাসনে ঋণের পাহাড়, অচল অর্থনীতি: ইউনূসের ব্যর্থতায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা ও পরিবারের বিরুদ্ধে তামাশার রায় প্রত্যাখ্যান, তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ আওয়ামী লীগের

এটাই শেষ সুযোগ, একতরফা নির্বাচন বয়কট করে জামায়াত-বিএনপিকে প্রতিরোধে জয়ের আহ্বান

১০

বাংলাদেশে কীভাবে হবে গণতন্ত্রের নিরাপদ উত্তরণ?

১১

কর্মজীবী নারীরা পতিতা? জামায়াতের মধ্যযুগীয় রাজনীতির ভয়ংকর মুখোশ খুলে গেছে

১২

গণপিটুনি, অজ্ঞাত লাশ ও হেফাজতে মৃত্যুর ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি: এমএসএফ

১৩

১৭ মাসে ‘নাই’ ৬ হাজার মানুষ: ইউনূসের দুঃশাসনে গুম ও ভয়ের রাজত্বের নগ্ন চিত্র

১৪

অনিরাপদ বাংলাদেশে বৈশ্বিক উদ্বেগ: মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা

১৫

কেন দেশের মানুষ এখনো শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বের আসনে চায়?

১৬

ইসির সক্রিয় হবার ভান: হ্যাঁ-এর পক্ষে সরকারী কর্মচারীদের প্রচার দণ্ডনীয় অপরাধ

১৭

সেনাপ্রধানের ইউনিফর্মের হাতা ধরে হাঁটা: ভণ্ডামির নমুনায় আরেকবার ইউনূস

১৮

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইয়া মীর জাফর মোশতাকের প্রতিভূ 

১৯

মার্ক টালির মৃত্যুতে শেখ হাসিনার শোক: বাংলাদেশ হারাল মুক্তিযুদ্ধের নির্ভীক বন্ধু

২০