ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট–২০২৬ অনুযায়ী, আগামী বছরে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার ও সংগঠিত অপরাধ দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ডব্লিউইএফের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য মোট পাঁচটি বড় ঝুঁকি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে অপরাধ ও অবৈধ কর্মকাণ্ড। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দুর্বল ব্যবস্থা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও রপ্তানি সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে কঠোর নজরদারি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তৃতীয় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে এবং ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্প ও ব্যবসা খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে।
চতুর্থ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। বৈশ্বিক মন্দার চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ সংকোচনের কারণে অর্থনৈতিক গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হতে পারে এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পঞ্চম ঝুঁকি হলো ঋণের চাপ। সরকারি, বেসরকারি ও পারিবারিক ঋণ—সব মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ডব্লিউইএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঋণের সুদ পরিশোধ ও বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
ডব্লিউইএফের এই ঝুঁকি মূল্যায়নে দেশের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট নির্বাহীর মতামত নেওয়া হয়েছে। তাদের বড় অংশই জানিয়েছেন, অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই বর্তমানে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও বিপজ্জনক সমস্যা। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অবৈধ কর আদায় এবং অর্থপাচার বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডব্লিউইএফের এই সতর্কতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অপরাধ দমন, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অবৈধ অর্থপ্রবাহ বন্ধ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি না করা গেলে এসব ঝুঁকি আগামী দিনে আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।
ডব্লিউইএফ আরও সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিক পর্যায়ে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সামাজিক মেরুকরণ এবং ভুল তথ্যের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। এসব বৈশ্বিক ঝুঁকির প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডব্লিউইএফ চিহ্নিত ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি কঠিন বছর হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন