অবৈধ ইউনূস সরকারের কারাগার রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে শুরু থেকেই। এর আগেও বহুবার কারাগারে সংঘটিত হয়েছে অমানবিকতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর পরিকল্পিত নিপীড়ন। কিন্তু ষড়যন্ত্র ও জঙ্গি হামলার মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা ইউনূস সরকারের শাসনামলে সেই অমানবিকতার রূপ যেন আরও নগ্ন, আরও নির্লজ্জ। আজ কারাগারে কোনো আইনী প্রক্রিয়ার অংশ নয়—এটি পরিণত হয়েছে মুক্তিযু্দ্ধের স্বপক্ষের নেতা-কর্মী-সমর্থক নিধনের নীরব মঞ্চ। সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ শিকার, কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন।
৭ই ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে দিনাজপুর জেলা কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি—তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে “ব্রট ডেথ” ঘোষণা করেন। অর্থাৎ তিনি হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। প্রশ্ন একটাই—একজন ৮৬ বছর বয়সী গুরুতর অসুস্থ রাজনীতিককে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হলো না কেন? কেন তাকে জামিন দেওয়া হলো না? কেন মানবিক বিবেচনা উপেক্ষা করা হলো?
রমেশ চন্দ্র সেন কোনো অপরাধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির একজন প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতা। ১৯৪০ সালের ৩০শে এপ্রিল ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কশালগাঁও গ্রামে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেছেন। ১৯৯৭ সালের উপনির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—মোট পাঁচবার তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রী ছিলেন। একনেকের সদস্য, খাদ্যমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য—রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্তরেই ছিল তার সক্রিয় ভূমিকা। অথচ সেই মানুষটিকেই ইউনূস সরকারের আমলে বন্দি করে রাখা হলো এমনভাবে, যেন তিনি কোনো মানবিক মর্যাদার দাবিদার নন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ষড়যন্ত্র ও অস্থিরতার পর পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান শুরু হয়। রমেশ চন্দ্র সেনকে ১৬ই আগস্ট নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। হত্যাসহ তিনটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়—যেসব মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা বিবেচনায় নিয়ে জামিন দেওয়ার ন্যূনতম অধিকার মেনে নেয়নি ইউনূস সরকার।
কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে—এমন তথ্য কারা প্রশাসনের জানা থাকার পরও কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবার, দলীয় নেতারা বারবার চিকিৎসা ও জামিনের আবেদন করলেও রাষ্ট্রীয় যন্ত্র বাধা দিয়ে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত সেই অবহেলার পরিণতি এই মৃত্যু।
মানবিকতা ও আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। বরং পরিকল্পিত চিকিৎসা-বঞ্চনার ফল তথা রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। যখন একজন প্রবীণ রাজনৈতিক বন্দি জামিন ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়ে কারাগারেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তখন সেটিকে আর স্বাভাবিক বা দুর্ঘটনা বলা যায় না।
রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের মৃত্যু একই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান। তখনও কারা কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে ব্যস্ত ছিল। কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি, কোনো জবাবদিহি হয়নি।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইউনূস সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যত রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জামিনে বাধা, চিকিৎসা-বঞ্চনা এবং হেফাজতে মৃত্যু—সব মিলিয়ে এটি একটি সুসংগঠিত দমননীতির চিত্র। সংবিধান, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার—সব শব্দই এখানে অর্থহীন।
আওয়ামী লীগ মনে করে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় না আসা বলেই এই সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়। তাই তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ রমেশ চন্দ্র সেন, কাল হয়তো আরও কেউ।
রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু ইতিহাসে শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ হিসেবে থাকবে না। এটি থাকবে একের পর এক জেলহত্যার প্রমাণ হিসেবে। প্রশ্ন একটাই—এই মৃত্যুর দায় থেকে কোনোদিন ইউনূস সরকার রেহাই পাবে? ইতিহাস নিশ্চুপ থাকে না। আজ না হোক, কাল—এই জুলুমের হিসাব দিতেই হবে।
মন্তব্য করুন