২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল, তাকে তখন উপস্থাপন করা হয়েছিল একটি ন্যায়সংগত, বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলন হিসেবে। বলা হয়েছিল, এই আন্দোলনের লক্ষ্য একটাই—মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন, যেখানে বিশেষ সুবিধা বা কোটার কোনো স্থান থাকবে না। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই আন্দোলনের বাস্তব চরিত্র উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কোটা বিরোধিতার স্লোগান ছিল মূলত একটি ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার, যার আড়ালে গড়ে উঠেছে নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী।
সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপনে জানা গেছে, ওসমান বিন হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদিকে ব্রিটেনে বাংলাদেশ দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যে আন্দোলন কোটা বাতিলের দাবিতে রাজপথ অচল করেছিল, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছিল, সেই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য কীভাবে আজ রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধার অংশীদার হন?
এটা কোনো একক ঘটনা হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরে ৯ জনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক চাকরি দেওয়া হয়েছে, যাদের নিয়োগকে ইতিপূর্বে আন্দোলনের সঙ্গেই যুক্ত ‘জুলাই একশন’-এর অংশ হিসেবে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই নিয়োগে তাদের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—পোর্ট ট্রেনিং সেন্টার, হাইড্রোগ্রাফি, বিদ্যুৎ, পরিকল্পনা ও অর্থবিভাগে। তাদের বলেছেন, এই নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক, এবং নিয়মিত সরকারি স্থায়ী পদের সাথে যুক্ত নয়; তবুও এটি আন্দোলন-সম্পৃক্ত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশেষ সুবিধা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
এই নিয়োগ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতির একটি প্রতীকী উদাহরণ। কোটা আন্দোলনের সময় যেসব মুখ সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল, যাদের বক্তব্যে ছিল চরম উত্তেজনা, রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য অবিশ্বাস এবং ‘সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়ার’ হুমকি—আজ দেখা যাচ্ছে, সেই বৃত্তের ভেতর থেকেই গড়ে উঠছে নতুন রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী শ্রেণি।
জুলাইয়ের সেই আন্দোলনের সময় বহু বিশ্লেষক সতর্ক করেছিলেন—এই আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে মব মানসিকতা, উগ্রতা এবং আদর্শগত অস্পষ্টতা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, প্রশাসনিক কাঠামোকে অচল করে দেওয়াই যেন হয়ে উঠেছিল প্রধান কৌশল। তখন এসব প্রশ্ন তুললে আন্দোলনবিরোধী বা ক্ষমতাসীনদের দালাল আখ্যা দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ সেই প্রশ্নগুলোই আরও জোরালোভাবে ফিরে আসছে, যখন দেখা যাচ্ছে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা একের পর এক রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।
দূতাবাসের মতো সংবেদনশীল ও কৌশলগত জায়গায় নিয়োগ মানেই কেবল একটি চাকরি নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি বহনের দায়িত্ব। সেখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। কিন্তু যখন এমন নিয়োগের সঙ্গে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচিত নাম যুক্ত হয়, তখন জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জন্ম নেয়—এই নিয়োগ কি যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি আন্দোলনের পুরস্কার?
সমালোচকদের মতে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে কোটা আন্দোলন আদতে কোনো কাঠামোগত সংস্কারের সংগ্রাম ছিল না। এটি ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের একটি প্রকল্প। রাজপথে আবেগ উসকে দিয়ে, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে, নির্বাচিত সরকারকে বিদায় করার পর যারা ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছেন, তারাই আজ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে নিজেদের জন্য নতুন ‘কোটা’ নিশ্চিত করছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায় সাধারণ তরুণদের নিয়ে। যারা আন্দোলনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, যারা বিশ্বাস করেছিল কোটা ব্যবস্থা ভেঙে একটি ন্যায্য রাষ্ট্র গড়া হবে—তারা আজ কোথায়? তারা আজও বেকার, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। আর আন্দোলনের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত পরিবার ও গোষ্ঠী আজ বিদেশি দূতাবাস, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তার ছায়ায়।
এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, কোটা বিরোধিতা ছিল একটি রাজনৈতিক মুখোশ। মুখোশের আড়ালে ছিল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, আর ক্ষমতায় পৌঁছানোর পর সেই একই কোটাকে আরও নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা। ইতিহাস হয়তো এই আন্দোলনকে মনে রাখবে ন্যায়বিচারের সংগ্রাম হিসেবে নয়, বরং ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদের এক নির্লজ্জ উদাহরণ হিসেবে।
মন্তব্য করুন