বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে যত বিতর্ক রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তার সবচেয়ে কদর্য ও নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক বক্তব্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X)-এ তাঁর যাচাইকৃত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত লেখায় কর্মজীবী নারীদের এমন ভাষায় উপস্থাপন করা হয়, যা শুধু আপত্তিকর নয়—এটি সরাসরি নারীর অস্তিত্ব, সম্মান ও সামাজিক ভূমিকার ওপর আঘাত।
ভাইরাল হওয়া ওই বক্তব্যে শফিকুর রহমান নারীদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণকে ‘আধুনিকতা’ নয়, বরং নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। সেখানে তিনি কর্মজীবী নারীদের জীবনধারাকে এমনভাবে বর্ণনা করেন, যা কার্যত পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনীয়—এক ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ ও ঘৃণ্য মন্তব্যের মাধ্যমে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করলে, নেতৃত্বে এলে কিংবা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলে সমাজ নষ্ট হয় এবং সেটি নৈতিকতার পরিপন্থী। এই বক্তব্যে কর্মজীবী নারীদের শুধু অবমাননা করা হয়নি; তাদের সামাজিক অবদানকে বিকৃত ও কলঙ্কিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
এই মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ভাষাগত ভুল নয়; এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের প্রতিফলন। নারীর শ্রম, মেধা ও নেতৃত্বকে অস্বীকার করে তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা—এটাই যুগ যুগ ধরে ধর্মভিত্তিক পশ্চাৎপদ রাজনীতির প্রধান অস্ত্র। শফিকুর রহমানের নামে প্রকাশিত বক্তব্য সেই পুরোনো মানসিকতাকেই আবারও নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বক্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলো একে চরম নারীবিদ্বেষী ও অসভ্য মন্তব্য হিসেবে আখ্যা দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জামায়াতে ইসলামী দ্রুত দাবি তোলে—এই পোস্ট তাদের আমিরের নয়, তাঁর অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করা হয়েছিল। অথচ প্রশ্ন থেকেই যায়, যে বক্তব্য জামায়াতের দীর্ঘদিনের নারীবিষয়ক অবস্থানের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিকে কীভাবে কেবল একটি সাইবার হামলার ফল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
চাপের মুখে পড়ে শফিকুর রহমান নিজেও ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, ওই বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত মত নয় এবং নারীর শিক্ষা, কর্মজীবন ও নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি নীতিগতভাবে সমর্থক। তিনি বলেন, নারীর মর্যাদা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যে বক্তব্যে কর্মজীবী নারীদের পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তা শুধু প্রযুক্তিগত হ্যাকিং দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এটি একটি গভীর আদর্শিক সংকটেরই প্রকাশ।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো এমন শক্তি সক্রিয় আছে, যারা নারীর স্বাধীনতা ও শ্রমকে সম্মান না করে তাকে নিয়ন্ত্রণ ও কলঙ্কিত করার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। আজকের বাংলাদেশে নারী প্রশাসনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সেই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে কর্মজীবী নারীদের পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা মানে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকেই অপমান করা।
হ্যাকিংয়ের কথা বলে সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে না। যে ভাষা, যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং যে মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অধিকার প্রশ্নে এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এটি শুধু একটি পোস্টের বিতর্ক নয়—এটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ও মধ্যযুগীয় নারীবিদ্বেষী রাজনীতির সরাসরি সংঘর্ষ। আর এই সংঘর্ষে কোন পক্ষ ইতিহাসের পক্ষে, তা বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যেই বুঝে ফেলেছে।
মন্তব্য করুন