
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় ভার্চুয়াল বক্তব্যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংস জঙ্গি উত্থান ও আসন্ন একতরফা জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র এবং তার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। বক্তব্যে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট সংঘাতের প্রেক্ষাপট, সহিংসতার দায়, সরকার পতনের ঘটনা এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
সোমবার ভারতের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘খোলা হাওয়া’র উদ্যোগে কলকাতায় “INSHALLAH BANGLADESH” বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে যুক্ত হন জয়। বইটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট সংগঠিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিক দীপ হালদার, জয়দীপ মজুমদার ও বাংলাদেশের সাংবাদিক শহিদুল হাসান খোকন যৌথভাবে লিখেন। সেখানে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবি আদতে ন্যায্য ছিল। তাঁর ভাষায়, “আমাদের সরকার বহু আগেই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তা পুনর্বহাল করতে হয়। আমরা বিষয়টি পুরোপুরি আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন মনে করি, এটিই আমাদের একটি বড় ব্যর্থতা।”
জয় জানান, ওই কোটা সংস্কার আন্দোলনই ধীরে ধীরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রূপ নেয় এবং সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলন দমনে সরকারের ভূমিকা এবং পুলিশের ব্যবহৃত কৌশল নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এ বিষয়ে নিজের ব্যাখ্যায় জয় বলেন, তাঁর মায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিং আদালতে পেশ করা হয়েছে, যেখানে পরিস্থিতির ভয়াবহতার প্রমাণ রয়েছে। “ওই অডিওতে শোনা যাবে, জঙ্গিরা থানায় হামলা চালাচ্ছে—এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেই সময় থেকেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। বহু নিরীহ বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হন। প্রতিটি মৃত্যুই দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সরকার কখনোই চায়নি কারও প্রাণ যাক। কিন্তু বাস্তবে তা হয়েছে। সহিংসতা সরকার শুরু করেনি, জঙ্গিরাই শুরু করেছিল,”—বলেন জয়।
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ‘জঙ্গি’ বলতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের তিনি বোঝাননি। তাঁর দাবি, আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠী ও জঙ্গি শক্তি আড়াল থেকে পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পেছনেও এই ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের সর্বোচ্চ সমর্থন রয়েছে। তিনি বলেন, “আন্দোলনকারী ছাত্রদের সবাই জঙ্গি বা ধর্মীয় কট্টরপন্থী ছিল না। কিন্তু এসব কট্টরপন্থী গোষ্ঠী আন্দোলনের আড়ালে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তারা দাবি করেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন না ধরালে আন্দোলন সফল হতো না।”
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি জানান, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না, কারণ বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নাকি ছাত্রদের হত্যা করেছে। আন্দোলনের সময় বহু ছাত্র ও নিরীহ মানুষ মারা গেছেন—এটা সত্য। কিন্তু একই সময়ে বহু পুলিশ সদস্য ও আমাদের দলের কর্মীরাও নিহত হয়েছেন।”
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জয় দাবি করেন, আন্দোলনের সময় প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি ৫ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে কয়েকশ মানুষের হত্যার কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, “এই সময়টাতে আমাদের সরকার ক্ষমতায় ছিল না। ওই দশ দিনে পরিকল্পিতভাবে আমাদের দলীয় কর্মী ও পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একতরফা ও সংকুচিত বলেও মন্তব্য করেন জয়। তাঁর দাবি, শুধু আওয়ামী লীগ নয়, দেশের অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এখন পরিস্থিতি এমন যে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই চলছে। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের নির্বাচনী কর্মসূচিও করতে দেওয়া হচ্ছে না। এটি আদতে একটি একতরফা নির্বাচন।”
নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হাসিনাপুত্র। বিএনপিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘হাতের পুতুল’ বলে কটাক্ষ করেন এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেন, জামায়াত সরকারে না এলেও বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার করবে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জয়ের ভাষায়, “বিএনপি ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, জামায়াত বাইরে থেকেই প্রভাব খাটাবে। বিএনপি আমেরিকার পুতুল হয়ে থাকবে। ফলে জামায়াত যা খুশি তাই করতে পারবে। এতে পাকিস্তানও ফ্রি হ্যান্ড পাবে। ভারতের পূর্ব সীমান্তের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জয় বলেন, আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। তাঁর কথায়, “এটাই শেষ সুযোগ। এখনই কিছু না করলে জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতির মূল শক্তিতে পরিণত হবে অর্থাৎ বাংলাদেশ ৫ -১০ বছর এমনকি তার চেয়ে বেশি সময় উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর আয়ত্ত্বে চলে যাবে। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোর উচিত এই নির্বাচনের নিন্দা জানানো এবং গণতন্ত্র রক্ষায় ভূমিকা রাখা।”
মন্তব্য করুন