ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে রক্ষা করার একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ। আল জাজিরার অনুসন্ধানী সিরিজ “Bangladesh: A Democratic Test”-এর দ্বিতীয় পর্বে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, সরকার পতন, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ, নির্বাচন প্রক্রিয়া ও দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা যদি হত্যার নির্দেশ দিতেন, তাহলে তিনি আজও ক্ষমতায় থাকতেন
জুলাই–আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন প্রসঙ্গে জয় স্বীকার করেন যে আন্দোলনটি মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ ও সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সহিংস এবং সেই সময়ে কিছু নিরাপত্তা সদস্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। তবে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ শেখ হাসিনা দিয়েছেন—এমন অভিযোগ তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তার ভাষায়, শেখ হাসিনা যদি হত্যার নির্দেশ দিতেন, তাহলে তিনি আজও ক্ষমতায় থাকতেন। জয় বলেন, সেই সময় শত শত পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন এবং সরকার তদন্ত ও জবাবদিহির উদ্যোগ নিয়েছিল।
শেখ হাসিনার কথিত অডিও ক্লিপ প্রসঙ্গে জয় বলেন, কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিকৃত করেছে। তার দাবি, শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল এলে তা প্রতিহত করলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে এবং তিনি সেই রক্তপাতের দায় নিতে চান না। জয় বলেন, এই বক্তব্যই প্রমাণ করে শেখ হাসিনা সহিংসতা চাননি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদনকে একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করে জয় প্রশ্ন তোলেন, সরকার পতনের পর ৫ আগস্টের পর যে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, তাদের দায় কার? তার মতে, ন্যায়বিচার যদি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে তা সবার জন্য সমান হতে হবে; একপাক্ষিক বিচার ন্যায়বিচার নয়।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে জয় অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নিষিদ্ধকরণ ছিল আদালতের রায়, সংবিধানবিরোধী কার্যক্রমের কারণে। অথচ বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের নামে প্রহসন।
বিগত নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ প্রসঙ্গে জয় বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই দেশি ও আন্তর্জাতিক জরিপে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পূর্বাভাস ছিল। তার দাবি, প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করলেও দলীয়ভাবে কারচুপির কোনো প্রয়োজন ছিল না। একইভাবে ২০২৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলোর বয়কটের কারণেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে আওয়ামী লীগের সরাসরি ভূমিকা ছিল না।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনকে জয় “মঞ্চস্থ নাটক” বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি পোস্টাল ব্যালট কারচুপির অভিযোগ তুলে ধরে এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলেন।
আওয়ামী লীগকে ঘিরে সহিংসতার অভিযোগ প্রসঙ্গে জয় বলেন, দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করলে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়—এটি হুমকি নয়, বাস্তবতা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ সহিংসতা চায় না, কিন্তু রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সব পথ বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।
আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জয় বলেন, সরকার পতনের পর থেকে শত শত কর্মী নিহত হয়েছেন, অন্তত ৩০ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন এবং হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তার প্রশ্ন—এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কীভাবে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে?
নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে জয় বলেন, তার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি গোপন সম্পদ বা দুর্নীতি থাকত, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলোই প্রথম তা শনাক্ত করত। তিনি স্বীকার করেন, কোনো দেশেই দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে আওয়ামী লীগ সরকার তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় প্রসঙ্গে জয় বলেন, এটি ছিল একটি সাজানো বিচার। তার অভিযোগ, শেখ হাসিনাকে আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ না দিয়েই আইন পরিবর্তন করে বিচার চালানো হয়েছে, যা মৌলিক আইনের পরিপন্থী।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে জয় বলেন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অটুট থাকবে। এটি দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম দল এবং এখনো ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে। শেখ হাসিনার অবসর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ব্যক্তি নয়—একটি প্রতিষ্ঠান। নেতা ছাড়াও দল টিকে থাকবে।
তার ভাষায়, ১৭ বছরের শাসনে ভুল হয়েছে, কিছু নেতা জবাবদিহির বাইরে ছিলেন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় দেশ আরও ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছে—অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গুর, সন্ত্রাস ও নির্বাচনী প্রহসন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জয় বলেন, বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের পথে ফেরাতে আওয়ামী লীগই একমাত্র বাস্তব বিকল্প।
মন্তব্য করুন