নয়াদিল্লি, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬:
বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি—এই বাস্তবতাকে সামনে এনে আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালো অবস্থান নিলেন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ায় (এফসিসি) আয়োজিত ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তার মাধ্যমে দেওয়া তাঁর ভাষণ ছিল স্পষ্ট, কঠোর ও দিকনির্দেশনামূলক। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন একটি রাজনৈতিক রোডম্যাপে—যার কেন্দ্রে রয়েছে অসাংবিধানিক ইউনূস প্রশাসন থেকে দেশ উদ্ধারের পাঁচ দফা ঘোষণা।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ আর স্বাভাবিক কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নেই। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে একটি ম্যান্ডেটবিহীন গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে, যা সংবিধানকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “এটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র দখলের অপচেষ্টা।” তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ব্যবস্থাকে ‘অবৈধ’, ‘দখলদার’ ও ‘সহিংস’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই প্রশাসনের অধীনে বাংলাদেশ একটি অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও অরাজকতার পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ভাষণে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ইউনূস প্রশাসন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দমননীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা, মব জাস্টিস, লুটতরাজ ও চাঁদাবাজি—সব মিলিয়ে দেশ আজ ভয়ভীতির এক অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তারা কীভাবে গণতন্ত্রের কথা বলে?
এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে দেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো পাঁচ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংবিধান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। তাঁর প্রথম ও প্রধান দাবি—মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির স্বার্থে অবিলম্বে অসাংবিধানিক ইউনূস প্রশাসন অপসারণ। তিনি বলেন, অবৈধ কাঠামোর অধীনে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
দ্বিতীয় দফায় তিনি দেশের সর্বত্র চলমান সহিংসতা বন্ধ করে আইনের শাসন ও জননিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। শেখ হাসিনার মতে, রাষ্ট্র যখন নাগরিকের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেটি রাষ্ট্র হিসেবে তার নৈতিক বৈধতা হারায়।
তৃতীয় দফায় তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী, শিশু ও অসহায় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, এই জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলাই প্রমাণ করে যে বর্তমান শাসনব্যবস্থা মানবিক মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
চতুর্থ দফায় শেখ হাসিনা সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার এবং বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থা যখন প্রতিশোধের যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্রের শেষ স্তম্ভটিও ভেঙে পড়ে।
সবশেষে, পঞ্চম দফায় তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেন—গত এক বছরে সংঘটিত সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ঘটনায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি নতুন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত অপরিহার্য। তাঁর মতে, সত্যকে চাপা দেওয়া গেলেও ইতিহাসকে দমন করা যায় না, আর আন্তর্জাতিক তদন্তই পারে বাস্তবতা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের ধারক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে রাষ্ট্রের জন্ম, সেই রাষ্ট্রের আদর্শ ধ্বংস করাই আজকের ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য। বর্তমান সংকট আসলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বনাম পরাজিত অপশক্তির সংঘাত—এ কথা তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তুলে ধরেন।
ভাষণের শেষাংশে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান—ভয় নয়, ঐক্যই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। একই সঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিও তাঁর বার্তা ছিল স্পষ্ট: একটি অবৈধ ও দমনমূলক ব্যবস্থাকে সমর্থন দেওয়া মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক শান্তিকে বিপন্ন করা।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার পাঁচ দফা ঘোষণা এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি অসাংবিধানিক ইউনূস প্রশাসন থেকে দেশ উদ্ধারের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ—যার দিকে তাকিয়ে আছে দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক বিবেক।
মন্তব্য করুন